মঙ্গলবার ১৬ অক্টোবর ২০১৮



কালীগঞ্জে শহীদ ময়েজউদ্দিন আহমেদের ৩৪তম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালন


আলোকিত সময় :
28.09.2018

কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধিঃ

গাজীপুরের কালীগঞ্জে ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে জীবন দান করে শাহাদাৎবরণকারী দুঃসাহসী রাজনৈতিক নেতা ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনা কমিটির আহবায়ক এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ এর ৩৪তম শাহাদাৎ বার্ষিকী গতকাল বৃহস্পতিবার পালন করা হয়েছে। এদিনটিকে ঘিরে গাজীপুর জেলা ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংঘঠন বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে।
গাজীপুর জেলা ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে সকাল ৯টায় শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ এর বনানীস্থ কবরস্থানে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন গাজীপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইকবাল হোসেন সবুজ, মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি এ্যাডঃ আজমত উল্লাহ খান, কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গণি ভুইয়া, কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন পলাশ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুঃ মুশফিকুর রহমান, উপজেলা আওয়ামীলীগের যুব বিষয়ক সম্পাদক মোঃ মাইনুল ইসলামসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এর আগে সকাল ৮টায় শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ এর কবরস্থানে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ডাকসু’র সাবেক ভিপি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারউজ্জামান, সাবেক এমপি। এসময় গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ম. জবলুর রহমান, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোঃ আফসার হোসেন, কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি বেনজির আহমেদ, সাবেক ছাত্র নেতা এস.এম ইকবাল হোসেনসহ আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সকাল ১১টায় কালীগঞ্জ পৌর আওয়ামীলীগের উদ্যোগে দলীয় কার্যালয়ে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। পৌর যুবলীগের উদ্যোগে সকাল সাড়ে ১১টায় উপজেলা চত্বরে শহীদ ময়েজউদ্দিন আহমেদ এর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করা হয়। দুপুরে শহীদ ময়েজউদ্দিন ফেরীঘাটে আলোচনা ও মিলাদ মাহফিল শেষে গণভোজের আয়োজন করা হয়। শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ এর নিজ বাড়ী উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়হরা গ্রামে মিলাদ মাহফিল ও কাঙ্গালীভোজের আয়োজন করা হয়।
শহীদ ময়েজউদ্দিন ছিলেন একজন দুঃসাহসী রাজনৈতিক নেতা। সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতাই শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদকে সময়ের অন্যতম সেরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন বড় বড় রাজনৈতিক নেতা ও বিখ্যাত আইনজীবীরা শেখ মুজিবুর রহমানের মামলা পরিচালনা করতে সাহস পায়নি। কিন্তু অকুতোভয় এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে মামলার দায়িত্বভার গ্রহণ করে একজন সাহসী আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে গোটা জাতির কাছে পরিচিতি লাভ করেন এবং বাঙালীর হৃদয়ে স্থান করে নেন। শুধু তাই নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির উপর দিয়ে যখন কাক পক্ষিও ভয়ে উড়াল দিত না তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও সেনা প্রধান ইয়াহিয়া খানের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনা কমিটির আহবায়কের দায়িত্বও গ্রহণ করেন এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ।
তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক জান্তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি পরিচালনা করা ছিল একটি দুঃসাহসী কাজ। এ কাজটি সে ব্যক্তিই করতে পারেন যার মধ্যে আছে জাতীয়তাবোধ, দেশ, মা ও মাটির টান। সে কাজটিই করেছিলেন দুঃসাহসী এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ।
১৯৬৮ সালের ৩রা জানুয়ারী আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাটি দায়ের করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। মামলায় অভিযোগ করা হয়, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। এই মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং মামলা। তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামেই বেশি পরিচিত। কারণ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল।
দেশ প্রেমিক শেখ মুজিব ছিলেন যাদুর কাঠি। তাঁকে পাকিস্তান সরকার আটক করলে বাঙালী জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খানের সিংহাসন টলোমলো হয়ে পড়ে। এমনি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রæয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ সকল বন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়। শেখ মুজিব হয়ে উঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আর মোঃ ময়েজউদ্দিন আহম্মেদ একজন সাহসী আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশে ইতিহাসের পাতায় ঠাই করে নেন।
৭০ এর নির্বাচনে কালীগঞ্জ থেকে এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহম্মেদ আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হয়ে নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপিএ নির্বাচিত হন।
বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ লক্ষ জনতার বিশাল জনসভায় স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গঁবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান কারাগারে নিয়ে গেলে তাজউদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর মনোনীত মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিয়োজিত হন। এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন বঙ্গঁবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে তাজউদ্দিন আহমেদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। দেশ স্বাধীন হলে বিশ্ব জনমতের চাপে পাকিস্তান সামরিক সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয় এবং তিনি ১০ জানুয়ারী ১৯৭১ স্বাধীন বাংলায় ফিরে আসেন।
এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ যুদ্ধ বিদ্ধস্ত সদ্যস্বাধীন দেশ পূর্ণগঠনের কাজে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়নে দ্বিতীয়বার কালীগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচিত হন। দেশি বিদেশী চক্রান্তে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গঁবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে। বঙ্গঁবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদকারীদের মধ্যে মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন অন্যতম একজন।
১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংঘটিত করেন। এ্যাডঃ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২২ দলীয় জোটের হরতাল কর্মসূচী পালন করতে এসে নিজ জন্মভূমি কালীগঞ্জে সামরিক জান্তা এরশাদের পা চাটা কিছু কুলাঙ্গারের ছুরির আঘাতে শাহাদাত বরণ করেন। শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে জীবন দিয়ে পুনরায় বিখ্যাত হয়ে প্রমাণ করেন ‘আমি মা, মাটি ও মানুষকে ভালবাসি’।
ক্যাপশনঃ ১। শহীদ মোঃ ময়েজউদ্দিন আহমেদ, ২। গাজীপুর জেলা ও কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ শহীদের বনানীস্থ কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে মোনাজাত করছেন ও ডাকসু’র সাবেক ভিপি ও গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারউজ্জামান শহীদের বনানীস্থ কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছেন।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি