মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » আজকের পত্রিকা » বড়পুকুরিয়ার কয়লার পর এবার মধ্যপাড়া পাথর খনি থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উধাও



বড়পুকুরিয়ার কয়লার পর এবার মধ্যপাড়া পাথর খনি থেকে তিন লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উধাও


আলোকিত সময় :
06.08.2018

ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি :

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কয়লা ঘাটতির তদন্ত শেষ না হতেই এবার দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়াতেও পাথর উধাও এর অভিযোগ উঠেছে। উত্তোলনকৃত পাথরের মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার বাজার মুল্য ৫৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। যদিও খনি কর্তৃপক্ষ বলছে পাথর উধাও হয়নি। এটা সিস্টেম লস।

খনি সুত্রে জানা গেছে, ১২ বছরে মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ৪৭২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ঘাটতি পাথরের মুল্য যোগ করা হলে এই লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে।

এই ঘটনায় খনি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পরষ্পর বিরোধি বক্তব্য পাওয়া গেছে। খনির নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পদ্ধতিগত ঘাটতি (সিস্টেম লস) বললেও অপর পক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে পাথরের ঘাটতি নাই। পাথর অবিক্রয় যোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে পাথর ইয়ার্ডে।

খনি সুত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে খনিটিতে বাণিজ্যিকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। চলতি সনের ৩১ জুলাই পর্যন্ত খনি থেকে পাথর উত্তোলন হয়েছে ৪১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ৩১ জুলাই, ২০১৮ পর্যন্ত বর্তমান ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পাথর উত্তোলন করেছে ২১ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন। গত ১২ বছরে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি। তবে বর্তমান হিসেবের সাথে অনেক পার্থক্য দেখা দিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

মধ্যপাড়া পাথর খনিতে প্রথম পাথর ঘাটতি দেখা দেয় ২০১২ সালে। এ নিয়ে তখন খনিটির মার্কেটিং বিভাগ ও প্রশাসন বিভাগ একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। সেই সময় ২ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি দেখা দেয়। এই ঘটনায় সেই সময় কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি। সেই ঘাটতির ঘটনা এক সময় ধামাচাপা পড়ে যায়। সম্প্রতি বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কয়লা উধাও এর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে নতুন করে পাথর ঘাটতির ঘটনাটি সামনে উঠে আসে।
সূত্র আরো জানায়, গত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে পাথর ঘাটতির হিসাব খনিটির পরিচালনা পর্ষদের নিকট উত্থাপন করে খনি কর্তৃপক্ষ। এ সময় পরিচালনা পর্ষদ খনিটির মহা-ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) আবু তালেব ফরাজিকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।

মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব ফরাজির তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছর থেকে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছর পর্যন্ত উত্তোলনকৃত পাথরের হিসেবে ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ পাথরের পরিমাপ ভুল ও ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ পাথর পদ্ধতিগত ঘাটতি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন হয়েছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৯ মেট্রিক টন। ভুল পরিমাপ ও সিস্টেম লস বাদ দিলে উত্তোলনকৃত পাথরের হিসেব দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ মেট্রিক টন । এখানে ঘাটতি দেখা যায় ২ লাখ ২৭ হাজার ২৩৩ মেট্রিক টন । অপরদিকে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত উত্তোলনকৃত পাথরের দশ দশমিক ৩৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হয়েছে, এতে ঘাটতি রয়েছে ২৬ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন। মোট ঘাটতি ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেট্রিক টন।

সোমবার (৬ আগষ্ট) মধ্যপাড়া পাথর খনিতে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১১টি পাথর ইয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৫টি ইয়ার্ডে পাথর আছে, বাকি ৬টি ইয়ার্ডে কোন পাথর নাই। খনিটির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) আসাদুজ্জামান পাথর ইয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখিয়ে বলেন, এই পাথর ইয়ার্ডগুলো ৪ থেকে ৫ ফিট গভির ছিল, যা পাথর দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, যার একটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত প্রায় ৫০০ ফিট করে। তিনি বলেন যে পরিমাণ পাথর হিসেবে ঘাটতি রয়েছে তা হিসেবে থাকলেও সে পাথর এই ইয়ার্ডের মধ্যে অবিক্রয়যোগ্য অবস্থায় পরে আছে বলে তিনি দাবী করেন।

জানা গেছে, মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ২০০৬ সাল থেকে কোরিয়ান নামনাম কোম্পানীর হাতধরে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। কিন্তু আশানুরূপ পাথর উত্তোলন না হওয়ায়, খনিটি লোকসানের দিকে যায়। এ কারণে খনিটিকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পাথর উত্তোলন বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাথর উত্তোলন বৃদ্ধির জন্য ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জার্মানিয়া ট্রাষ্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) এর সাথে প্রতিদিন ৫ হাজার টন করে পাথর উত্তোলনের লক্ষমাত্রা নিয়ে ৬ বছরে ৯২ লাখ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলনের চুক্তি করে। জিটিসি ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে সফলতার সঙ্গে পাথর উত্তোলন করে আসছে। বর্তমানে খনিটিতে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৪,৮০০ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। এরই মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন পাথর উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটলো।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি