বৃহস্পতিবার ১৯ জুলাই ২০১৮



মিরসরাই ট্র্যাজেডির আজ ৭ বছর
স্মৃতির ফ্রেমে বন্দী ৪৫ প্রাণের স্বপ্ন


আলোকিত সময় :
11.07.2018

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি :
দেখতে দেখতে ৭ বছর পূর্ণ করলো মিরসরাই ট্র্যাজেডী। এখনও ৪৫ ছাত্রের স্বজনের বুকফাটা আহাজারীতে আবুতোরাবের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে। চোখের জল শুকিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে অকালে সন্তান হারা স্বজনরা। গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে আদরের সন্তানকে খুঁজে বেড়ায়। এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকেন অভাগীনি মা। গভীর রাতে ভেসে আসে কান্নার রোল। স্মৃতি বলতে শুধু ছবির ফ্রেম। পুত্রহারা পিতা-মাতারা সেই ছবি নিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে আহজারী করতে থাকেন। আবার কখনো কখনো নীরব নিস্তব্ধ হয়ে একেবারেই নির্বাক।

ট্র্যাজেডীতে নিহতদের বাড়িতে এক হৃদয় বিদায়ক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আদরের সন্তানের স্মৃতি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তারা। সান্ত¡না দিতে ছুটে যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দৌজা চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ বিদেশী প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

১১ জুলাই মিরসরাই ট্র্যাজেডীর ৭ বছর পূর্তি। সন্তান জন্ম নেয়ার পর অনেক বাবা-মা তাদের আদরের সন্তানের জন্ম দিন পালন করে থাকেন। কাটা হয় কেক। আয়োজন করা হয় হয়ে থাকে রকমারির খাবারের। কিন্তু কোন মা-বাবা কি আদরের সন্তানের মৃত্যু বার্ষিকী পালন করতে পারে!

২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ঘটেছিলো তেমনি একটি ঝড়। যে ঝড় কেড়ে নেয় ৪৫টি তাজা প্রাণ। ঝড়ের কবলে পড়ে পিতার কাঁধে উঠেছিল আদরের সন্তানের লাশ। ট্র্যাজেডীতে নিহতদের বাড়িতে স্বজনদের খোঁজ খবর নিতে গিয়ে এক হৃদয় বিদায়ক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আদরের সন্তানের স্মৃতি যেন কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তারা। ট্র্যাজেডীতে নিহত আনন্দ দাস, সাইদুল, নয়ন শীল, ইফতেখার, কামরুলের হতভাগীনী মায়েরা সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন, ছেলে বাড়ি ফিরবে, মা বলে ডাকবে এ আশায়।

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ৭ বছরের পূর্ণ হওয়ায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেক বলেন, দূর্ঘটনায় আমাদের স্কুলের ৩৪ জন ছাত্র মারা গেছে। তাদের শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়। এখনো মনে হচ্ছে তারা আমার আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। বিশেষ করে আবু সুফিয়ান, ধ্রæব নাথ ও কাজল নাথকে আমার খুব বেশি মনে পড়ছে। এরা তিনজনই খুব মেধাবী ছিল।
বিভীষিকাময় সেদিন যা ঘটেছিল :
১১ জুলাই ২০১১ (সোমবার) মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিল বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে একটি মিনি ট্রাকে করে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা। আবুতোরাব এলাকায় যাচ্ছিল তারা। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডোবায় উল্টে যায় মিনিট্রাকটি। ডোবার জল থেকে একে একে উঠে আসে লাশ আর লাশ। পরে সে লাশের মিছিল থামে পঁয়তালি­শে গিয়ে। অপর দিকে ছেলের মৃত্যুর খবরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান এক বাবা হরনাথ। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর রাত ৯ টায় নয়ন শীলের প্রয়ান পর্যন্ত ৪৫টি মৃত্যু গুনতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডী।

আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৩ শিক্ষার্থী মিরসরাই ট্র্যজেডীতে প্রাণ হারায়। এ ছাড়া আবুতোরাব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার ২, এবং আবুতোরাব এস এম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষার্থী মারা যায় এই দুর্ঘটনায়। ৪৫ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ৮ ডিসেম্বর চালক মো. মফিজুর রহমান ওরফে মফিজ উদ্দিনকে দুটি ধারায় মোট ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি