সোমবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮



ব্যাংক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব কমার সম্ভাবনা


আলোকিত সময় :
08.07.2018

আলোকিত অনলাইন ডেস্ক :

ব্যাংকঋণে সুদের হার কমানোকে কেন্দ্র করে এ বছর ব্যাংকগুলোর আয়ে বড় ধরণের নেতিবাচক ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, হঠাৎ করে গ্রাহকদের সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ দিতে গেলে ব্যাংকগুলোর এ বছর সুদ আয় কমে যাবে ১ থেকে ২ শতাংশ। এর প্রভাবে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে, যা টাকার অংকে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার মতো। এদিকে বাজেটে ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমানোর ফলে ব্যাংক খাত থেকে আরও প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আয় হবে সরকারের।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদ দেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর আয় আগের বছরের চেয়ে এবার কমে আসবে। ফলে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্বও কিছুটা কমে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুক্তি থাকার ফলে আমরা ইচ্ছে করলেও আমানতে সুদ কমাতে পারছি না। অথচ ঋণে আমরা সুদ কমাচ্ছি। ফলে ব্যাংকের ব্যয় না কমলেও আয় ঠিকই কমে যাবে। এ বছর আমরা এটা মেনে নিয়েছি।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি নাম প্রকাশ না করে বলেন, গত মাসেও ব্যাংকগুলো কয়েকটি খাতের ঋণে ১১ থেকে ১২ শতাংশ হারে সুদারোপ করেছে। এখন সেই সুদ হঠাৎ করে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে ব্যাংকের ২ থেকে ৩ শতাংশ লোকসান গুনতে হবে। তার মতে, এই লোকসানের প্রভাব গিয়ে পড়বে ব্যাংকের মুনাফায়। আর মুনাফা কমে গেলে সরকারের রাজস্বও কমে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে করপোরেট কর বাবদ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে করপোরেট কর বাবদ আদায় হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত অর্থবছরের চেয়ে সরকার এই অর্থ বছরে ব্যাংক খাত থেকে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব পাবে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়ার প্রকৃত হিসাব দেয়া না গেলেও বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, এমনিতেই করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর ফলে ব্যাংক খাত থেকে রাজস্ব বাবদ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা কম আয় হবে। এর সঙ্গে হঠাৎ করে ঋণে সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকের আয়ে একটা বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যা সরকারের রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বড় চাপ সৃষ্টি করবে।

জানা গেছে, করপোরেট করের মধ্যে ব্যাংক খাতে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ হয়। মোট করপোরেট করের ৭০ শতাংশ আয় হয় এই খাত থেকে। আবার এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) অফিসের অধীনে ভ্যাট দেওয়া শীর্ষ ১০টি খাতের অন্যতম হচ্ছে ব্যাংক খাত।

এর আগে, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বাজেটে ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) এক শতাংশ কমানো হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর হাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগযোগ্য তহবিল নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়াও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের ৫০ ভাগ স্বল্প সুদে বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মোট ৫ ধরণের সুবিধা দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

গত ২০ জুন সব ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। ঋণের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনার এই সিদ্ধান্ত ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার কথা।

এদিকে ব্যাংকগুলোর প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি থেকে মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ১৫ শতাংশ কমেছে। অবশ্য এই বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে বলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের অন্য একটি তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ব্যাংকগুলো ২৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। যা আগের বছরে ছিল ২১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি