শুক্রবার ১৬ নভেম্বর ২০১৮



বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা
হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘চাক’ জনগোষ্ঠী


আলোকিত সময় :
05.07.2018

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি :

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র ন-ৃজনগোষ্ঠীর অবহেলা আর অযতেœর মধ্যে রয়েছে ‘চাক’ জনগোষ্ঠী। সবদিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার পরও বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা যেন এখন একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ‘চাক’ জনগোষ্ঠীর মানুষ সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতা কামনা করেছেন।

চাক জনগোষ্ঠীর অনেকে জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর মধ্যে নবম সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো ‘চাক’। এ জনগোষ্ঠী মূলত বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বসবাস করে। এছাড়া অপর দুই পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে স্বল্পসংখ্যক চাক জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারাও চাকরির সুবাদে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে আসছে। এ জনগোষ্ঠীর মোট লোকসংখ্যা আনুমানিক ৩ হাজার। তবে জনসংখ্যার দিক থেকে কম হলেও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে শিক্ষার দিক দিয়ে তারা এগিয়ে। সুত্র জানায়, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নে ৬টি, দো’ছড়িতে ৩টি ও বাইশারী ইউনিয়নে ৪টি পাড়ায় এখনো সম্মিলিতভাবে বসবাস করে আসছে চাকরা। চাক জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী।

সূত্র মতে, চাকদের মধ্যে দুটি গোত্র আছে যারা আন্দো ও কাইংকাবেং নামে পরিচিত। এর মধ্যে আরও কয়েকটি উপগোত্র রয়েছে বলেও জানা যায়। ১৯৪৮ সালে ব্র²দেশ (মায়ানমার) স্বাধীনতা লাভ করলে মায়ূ পার্বত্যাঞ্চলে চলে আসেন চাক জনগোষ্ঠী। পরে চাক’রা ১৯৫৯ সালে ফের ওয়েলাতংয়ে নিজ ভূমিতে ফিরে যান। চাকরা মূলত চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে আরাকান হয়ে এ অঞ্চলে প্রবেশ করে।

সুত্র জানায়, তিবক্ষতী বর্মণ বংশভুক্ত হওয়ায় চাকদের গায়ের রং হলুদ ও শ্যাম বর্ণের। সদ্য ভূমিষ্ট বাচ্চা ও ছোটদের গায়ের রং বেশিরভাগ হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে। চাকদের মুখমন্ডল গোলাকার, চোখ ছোটাকার, নাক মঙ্গলীয়দের মত। তাঁদের মাঝারি কপাল, গাল বৃহদাকার, চোখের পাতা পুরু, ঠোট মাঝারি, নাকশিরা নয় চেপ্টা নয় সরু, গায়ের কেশ কম এবং মাথার চুল কালো ও শক্ত। চাক নারীদের কানের রূপচর্চা দেখে তাদেরকে অনায়াসে চেনা যায়। চাক নারীদের রূপচর্চার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কান ছিদ্র করে তাতে প্রথমে কালো সুতা তারপর ক্রমান্বয়ে একটার পর একটা বড় আকারে বাঁশের রিং পরিয়ে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি ব্যাসের বড় কান অর্থাৎ ছিদ্র বড় করা নারীদের আদি স্বভাব। চাক সমাজে বিবাহ উপলক্ষে বরপক্ষকে কনে পক্ষের বাড়িতে তিনবার যেতে হয়। প্রথমবার পাত্রের বাবা-মা পছন্দের পাত্রীর বাবা-মার বাড়িতে মদ ও মোরগ-মুরগি নিয়ে কনে দেখতে যায়। এ যাওয়াকে ‘আচংগা’ অর্থাৎ ‘কনে দেখা’ বলে।

বর্তমানে পাহাড়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে চাক জনগোষ্ঠীর জীবনধারণেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। নির্বিচারে বনাঞ্চল উজাড়, রাবার ও হর্টিকালচার বাগান সৃজনের নামে পাহাড়ি ভূমি দখলের কারণে হুমকির মুখে চাক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের পাশাপাশি পাহাড়ের জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে রয়েছে।

বাইশারী ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক উক্যচাইন চাক (জীবন) বলেন, চাক ছেলে-মেয়েদের যোগ্যতা ও মেধা থাকার পরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। মূলত আর্থিক সঙ্কটের কারণেই তারা এ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। পার্বত্যাঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীদের উন্নয়নের কথা বলে অনেক এনজিও সহযোগিতার নামে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। এরপরও এসব পরিবারের অনেকে কষ্ট করে ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা করাচ্ছেন। তাঁদের সন্তানরা পড়ালেখা শেষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরী করার সুযোগ পেয়েছেন। ক্ষুদ্র এ জনগোষ্ঠী চাক স¤প্রদায়ের মধ্যে ছয়জন এমবিবিএস ডাক্তারসহ, শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী ও এনজিও দপ্তরে কর্মরত আছেন বলে জানান।

জুম চাষ চাকদের প্রধান পেশা হলেও বহিরাগতদের দখলে থাকার কারণে অনেক চাক পরিবার নিজেদের জমি হারিয়েছে। যেমনটি হয়েছে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে বাইশারী ইউনিয়নের আলীক্ষ্যং বাদুরঝিরি চাক পাড়ায়। ভূমি দস্যুদের অপতৎপরতার কারণে সে সময়ে ২১টি চাক পরিবার নিজের বাস্তুভিটা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের চাক হেডম্যান পাড়ার প্রধান (কারবারী) অংথোয়াইচিং চাক জানান, বর্তমানে চাক স¤প্রদায় আর্থিক সংকট এবং অভাব-অনটনের পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায়ও ভুগছে। তারপরও তারা শিক্ষা ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ণ সংস্থাগুলোর সার্বিক সহযোগিতা না পেলে ক্ষুদ্র এ জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বাইশারী ইউনিয়নে কর্মরত এনজিও কর্মী স্বপন চাক জানান, চাকদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে নিজেদের শত বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তথা তাঁতশিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে নিজেদের পোশাক পরিচিতিও তারা ধরে রাখতে পারছে না। এজন্য উন্নয়ণ সংস্থাগুলোর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি