বুধবার ১৭ অক্টোবর ২০১৮



বগা লেক – অপার্থিব সৌন্দর্যের এক পার্থিব ক্যানভাস


আলোকিত সময় :
14.06.2018

অঞ্জন দাস

বাংলাদেশ যে কত সুন্দর- সেটা বান্দরবান না গেলে না গেলে আপনি বুঝতেই পারবেন না। তবে যারা বান্দরবানের নীলাচল, মেঘলা আর নীলগিরি ভ্রমণ করেই মনে করছেন বান্দরবানের সব সৌন্দর্য দেখে ফেলেছেন তাদের বলছি, বান্দরবানের আরও গভীরে যে কত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তা সেখানে না গেলে আন্দাজও করতে পারবেন না।
বান্দরবানে যে কয়টি অপার সৌন্দর্যের দর্শনীয় স্থান আছে বগালেক তার অন্যতম। স্থানীয় বম উপজাতিদের ভাষায় ‘বগা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘ড্রাগন’ বা এই জাতীয় প্রাণী। অনেকের কাছে এই লেক তাই ‘ড্রাগন লেক’ নামেও সুপরিচিত।

প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এখানে পাহাড়ের চূড়ায় জলরাশি সঞ্চার করে সৃষ্টি করেছে এই লেক। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ১৭০০ ফুট উপরে পাহাড় চূড়ায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত অত্যাশ্চর্য এই লেক। বিষয়টি যতটা না অবিশ্বাস্য, যতটা না অলৈাকিক তার চাইতেও ঢেড় বেশী এর সৌন্দর্য। স্নিগ্ধ-শান্তজলের এই লেক আকাশের কাছ থেকে একমুঠো নীল চুরি করে নিজেও সেজেছে নীলাম্বরী। পাহাড়ের চূড়ার নীল জলরাশি নীল আকাশের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে তৈরি করেছে এক দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক কোলাজ। নির্বাক চোখে মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে হয় এখানকার নীলাকাশ, মায়াবী পাহাড় আর জলের মিতালী। প্রকৃতি এখানে তার অকৃপণ হাতে ঢেলে দিয়েছে একরাশ সবুজের ছোঁয়া। তুলির নিপুণ আঁচড়ে বগালেকের পুরো ক্যানভাস জুড়ে প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে এঁকেছে এক মনোরম জলছবি।

বগালেক দুইভাবে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে সমাদৃত। গন্তব্য হিসেবে বগালেক যেমন জনপ্রিয় তেমনি পর্বতারোহীদের কাছে এই লেক অনেকটাই বেস ক্যাম্পের মতো। এ এমনই এক ছবি যা দেখামাত্র ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা-ক্লান্তি সব উবে যায়। মুহূর্তেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে আসার সমস্ত শ্রান্তি হারিয়ে যায় লেকের শীতল গহ্বরে। সবকিছু মিলিয়ে বগালেক সত্যিই এক অপার সৌন্দর্যের অপার্থিব লীলাভূমি।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলার কেউক্রাডং পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই হ্রদ। তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত এই লেক। এর গড় গভীরতা আনুমানিক ১৫০ ফুটের মত। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি হ্রদ। এর আশেপাশে পানির কোন উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে বগালেক যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে – যা বগাছড়া নামে সুপরিচিত। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই লেকের পানি প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসে ঘোলাটে বর্ণ ধারণ করে। তখন এই লেকের সাথে সাথে এর আশপাশ দিয়ে বহমান নদীগুলির পানিও একই রং ধারণ করে। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়। প্রচুর মাছ, জলজ প্রাণী ও লতাপাতায় ভরপুর এই হ্রদ।

সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত, প্রতি বেলাতেই বগালেক নতুন নতুন রূপে ধরা দেয় সৌন্দর্যপিপাসুদের কাছে। এর সৌন্দর্য কাগজে কলমে লিখে আসলে বোঝানো সম্ভব নয়। নিজ চোখে না দেখলে এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য কল্পনা করাও কঠিন। সকালের উজ্জ্বল আলো যেমন বগালেককে দেয় স্নিগ্ধ সতেজ রূপ, ঠিক তেমনি রাতের বেলায় এর মায়াবী হাতছানি উপেক্ষা করা সত্যিই দুরূহ। রাতের বগালেক দিনের বগালেক হতে একেবারেই আলাদা। আর যদি রাতটি হয় চাঁদনী রাত, তাহলেতো কথাই নেই। এই লেকের পারে উদ্যাপিত একটি চাঁদনী রাতই হতে পারে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠতম একটি রাত। ভাষায় অবর্ণনীয় সে রূপ। নিকষকালো অন্ধকার রাতে পাহাড়ের বুক চিড়ে হঠাৎ একফালি চাঁদ মৃদু আলোর ঝলক নিয়ে যখন ঝাঁপিয়ে পড়ে বগালেকের স্নিগ্ধ জলে। আর মৃদুমন্দ বাতাসে ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলায় লেকের পানিতে যখন দুলতে থাকে আকাশ থেকে নেমে আসা চাঁদের বাঁধ ভাঙ্গা জ্যোৎস্না তখন নিজেকে সামলে রাখা সত্যিই দায় হয়ে পড়ে। এমন মায়াবী জ্যোৎস্নায় গা ভিজিয়ে নির্বাক চোখে হারিয়ে যেতে কবি গুরুর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে তখন শুধু বলতে ইচ্ছে করে “এমন চাঁদের আলো, মরি যদি সেও ভালো। সে মরণ স্বর্গ সমান।”

জনমানবহীন নিস্তব্ধ, নিথর চারিদিক। নিজেকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাবার এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। আত্মোপলব্ধি করার এক অপার্থিব আয়োজন। সবাই যখন নিদ্রাদেবীর কোলে নিজেকে সঁপে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, সেই নির্জন বেলায় বগালেকের পাড়ে বসে চরাচর ভাসিয়ে নেয়া বান ডাকা জোছনায় আকণ্ঠ ডুবে থাকার অভিজ্ঞতা কোন বর্ণনাতেই যেন সঠিকভাবে মূর্ত হয়ে ওঠে না। বিমূর্ত থেকে যায় আরো কিছু। প্রহরের পর প্রহর চলে যাবে, কিন্তু আপনি বসে থাকবেন অপলক, অবিচল, আবেশহীন উন্মাদনায় আরো কিছু প্রাপ্তির আশায় ।

কিভাবে যাবেন :
দু’ভাবে আপনি যেতে পারেন এই লেকে। তবে যে ভাবেই যান না কেন, রুমা বাজারে আপনাকে যেতে হবেই। বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার পর্যন্ত বাস অথবা চাঁন্দের গাড়িতে যেতে হবে। বান্দরবান থেকে এক ঘণ্টা পর পর বাস ছাড়ে রুমা বাজারের উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চলে বাস সার্ভিস। ভাড়া ১০০ টাকা। চান্দের গাড়িতে যেতে চাইলে রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে হবে। ভাড়া কম বেশি ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ হাজার টাকা।

রুমা বাজার থেকে বগালেকের দূরত্ব মাত্র ২৯ কিলোমিটার। চান্দের গাড়িতে ভাড়া পড়বে ২,০০০ এবং ২,৫০০ টাকা। ১৫ থেকে ২০ জন যেতে পারবেন একসঙ্গে। আর অ্যাডভেঞ্চার করতে চাইলে এই ২৯ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে পারেন পায়ে হেঁটেই।

কোথায় থাকবেন:
বগা লেকে থাকতে হলে আপনাকে প্রতিদিন জনপ্রতি গুণতে হবে ১০০ টাকা। খাওয়ার জন্য রুমা বাজার থেকে প্রয়োজনীয় বাজার করে নিতে পারেন সাথে। চাইলে এখানেও খেতে পারবেন আপনি। তবে এখানে যে খাবারই আপনি খান না কেন, তা প্রতিবেলা ১০০ টাকার কম নয়। রুমা থেকে সঙ্গে করে আনা খাবারও রান্না করে খাওয়ার সুবিধা পাবেন এখানে। তবে খেয়াল রাখবেন সেটি যেন উটকো ঝামেলার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

 



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি