বৃহস্পতিবার ২৪ মে ২০১৮



তাবলিগ জামাতের বিভক্তি, বাংলাদেশেও প্রভাব


আলোকিত সময় :
08.05.2018

দিল্লি ও লাহোরের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে তাবলিগ জামাত। এই বিভক্তি অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। তবে বাংলাদেশের দ্বন্দ্বে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের বড় অংশ যুক্ত হয়েছে। তারা একটি পক্ষকে সমর্থন দেওয়ায় সহজে এ বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না বলে মনে করছেন তাবলিগ জামাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢাকায় তাবলিগের দুই পক্ষের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাবলিগের বর্তমান আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দ্বন্দ্বের শুরু। ২০১৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের লাহোরের রাইবেন্ডে ইজতেমা চলার সময় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্যের একটি ‘আলমি শুরা’ গঠনের প্রস্তাব আসে। সাদ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তারপরও ইজতেমা শেষে রাইবেন্ড থেকে শুরা বোর্ড গঠনের একটি চিঠি বিভিন্ন দেশে তাবলিগের দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর এক পক্ষ সাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং আরেক পক্ষ আলমি শুরা গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

জানা যায়, তাবলিগের এই বিভক্তির জেরে প্রথম প্রকাশ্য বিরোধ ও মারামারি হয় ২০১৬ সালের ১৯ জুন দিল্লিতে সংগঠনটির মূল কেন্দ্র বা মারকাজে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় যুক্তরাজ্যেও, লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ মারকাজটি দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেয়।

মাওলানা সাদকে নিয়ে বাংলাদেশে বিভেদ প্রকাশ্যভাবে দেখা দেয় গত জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা থেকে। তাবলিগ জামাতের যে অংশটি সাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। প্রবল বিরোধিতার কারণে ইজতেমায় অংশ নিতে পারেননি সাদ। তখন সাদ ও তাঁর অনুসারীরা কাকরাইলে তাবলিগের প্রধান কেন্দ্র বা মারকাজে অবস্থান নেন। এরপর থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ছাত্রদের নিয়ে এসে কাকরাইলের মারকাজের নিয়ন্ত্রণ নেন সাদবিরোধীরা। পরদিন কয়েক হাজার সাদপন্থী কাকরাইলে উপস্থিত হলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

সাদবিরোধীদের কওমি মাদ্রাসার সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ইলিয়াস ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং তিনি এখানকার আলেমদের পরামর্শ নিয়েই তাবলিগ পরিচালনা করতেন। সাদের বক্তব্যের বিষয়ে দেওবন্দের আলেমরা আপত্তি জানিয়েছেন। এ বিষয়টিই বাংলাদেশের আলেমদের এই বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলেছে।

এর সমাধান কী, এই প্রশ্নের জবাবে বেফাকের মহাসচিব বলেন, এ অবস্থায় সাদের নেতৃত্বে তাবলিগ আর পরিচালিত হতে পারে না।

দিল্লির মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) ১৯১০ সালে তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন। এর মূল মারকাজ দিল্লির হজরত নিজামউদ্দিনে অবস্থিত বেঙ্গলওয়ালি মসজিদে। ঢাকার কাকরাইল ও লাহোরের রাইবেন্ডের মারকাজ হলো শাখা মারকাজ। এই দুই স্থানে প্রতিবছর ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। কেবল বাংলাদেশের ইজতেমায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলিগের অনুসারীরা যোগ দেন।

বাংলাদেশে তাবলিগের কার্যক্রম পরিচালনা করেন ১১ জন শুরা সদস্য। এর মধ্যে কাকরাইল মসজিদের খতিব, পার্শ্ববর্তী উলুমে দীনিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম মুহাম্মাদ জুবায়েরসহ পাঁচজন সাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সাদের পক্ষে রয়েছেন আরেক শুরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফ ইসলামের নেতৃত্বে বাকি ছয়জন।

সাদবিরোধী একজন শুরা সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, সাদ বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। এর বিরুদ্ধে ভারতের দেওবন্দের আলেমরা অবস্থান নেন এবং এ জন্য সাদকে ক্ষমা চাইতে বলেন।

এদিকে মাওলানা সাদের অনুসারীরা বলছেন, সাদ তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তারপরও বিরোধিতা চলছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকায় সাদবিরোধী শুরা সদস্যদের একজন বলেন, সাদ কেবল হজরত মুসা (আ.)-কে নিয়ে করা তাঁর মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু এ রকম আরও অন্তত ৮৫টি মন্তব্য তিনি করেছেন, যার জন্য ক্ষমা চাননি।

অন্যদিকে সাদপন্থী শুরা সদস্যরা বলছেন, সাদের বক্তব্য মুখ্য বিষয় নয়। তাবলিগের নিয়ন্ত্রণ দিল্লির মারকাজ থেকে সরিয়ে রাইবেন্ডে নিয়ে যাওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য। মাওলানা সাদ প্রায় ২২ বছর ধরে ইজতেমায় বক্তব্য দিচ্ছেন। এত দিন কোনো আপত্তি ছিল না। নেতৃত্ব নিয়ে লাহোরের রাইবেন্ডের অবস্থানের পরপরই তাঁর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

তাবলিগের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভীর (রহ.) মৃত্যুর পর থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরাই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইলিয়াসের (রহ.) মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ আমির হন। বংশপরম্পরায় বিভিন্ন ব্যক্তির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় আমিরের দায়িত্বে আছেন মাওলানা সাদ।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি