মঙ্গলবার ১৪ অগাস্ট ২০১৮



অমিত-লাবণ্যর সেই ‘বাড়ি’


আলোকিত সময় :
08.05.2018

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘শিলংয়ের চিঠি’-তে লিখেছিলেন, ‘গর্মি যখন টুটলো না আর পাখার হাওয়া সরবতে, ঠাণ্ডা হতে দৌড়ে এলুম শিলং নামক পর্বতে।’
বাঙালির সকল আবেগেই কবিগুরু মিশে আছেন, ভ্রমণের উচ্ছ্বাসেও সে কথা সমভাবে প্রযোজ্য। ছবির মতো সুন্দর ভারতের শিলং, রবীন্দ্রপ্রেমীদের কাছে ভিন্ন আবেগের। এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘শেষের কবিতা’। শুধু কি তাই? ‘রক্তকরবী’ নাটক আর ‘যোগাযোগ’ উপন্যাস লেখার সূচনাও ঘটে এ শিলং থেকেই।
সম্প্রতি ছয় দিনের শিলং সফরের পঞ্চম দিনে শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত রবীন্দ্রনাথের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। পুরো সফরের সঙ্গী জিপচালক মাশুক বললেন, বাঙালি ছাড়া কেউ ওখানে যান না। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যখন রবীন্দ্রনাথের বাড়ির পথে জিপ চলছে, তখন ‘শেষের কবিতা’র লাইনগুলো বড্ড মনে পড়ছিল- ‘শিলং পাহাড়টা চারদিক থেকে অমিতকে নিজের মধ্যে যেন রসিয়ে নিচ্ছে। আজ সে উঠেছে সূর্য ওঠবার আগেই। জানলা দিয়ে দেখলে দেবদারু গাছের ঝালরগুলো যেন কাঁপছে, আর তার পিছনে পাতলা মেঘের ওপর পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্য তার তুলির লম্বা লম্বা টান লাগিয়েছে – আগুনজ্বলা যে সব রঙের আভা ফুটে উঠেছে। তার সম্বন্ধে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় নেই!’
অমিত, লাবণ্য, কেটি, যোগমায়ার কথা ভাবতে ভাবতেই এক সময় থামল জিপ। চারপাশে দেবদারু গাছের ফাঁক গলিয়ে চার কক্ষের ছোট্ট কাঠের বাড়িটি নজরে এলো। সামনে কোমরের পেছনে হাত দিয়ে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথ। বাংলা সাহিত্যের ঋষিতুল্য রবীন্দ্রনাথের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল অমিতকে- ‘দাড়িগোঁফ-কামানো, চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ণ পরিপুষ্ট মুখ,… চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না’।
এ বাড়িতেই অমিতের সঙ্গে  আমাদের পরিচিত করার পাশাপাশি যোগমায়ার মমতা আর লাবণ্যের ব্যক্তিত্বের স্বাদ দিয়েছিলেন কবিগুরু। শান্ত দুপুরে যখন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করি, চারপাশে তখন অন্যরকম এক আবেশ। দেয়ালে সাজানো বাহারি সব চিত্রকর্ম। রবীন্দ্রনাথের এ বাড়িটি এখন রবীন্দ্র আর্ট গ্যালারি হিসেবে পরিচিত। নাম না জানা চিত্রকরদের ক্যানভাসে শিলংয়ের সৌন্দর্য যেমন বর্ণিত, তেমনি নানা রূপে উঠে এসেছেন রবীন্দ্রনাথও। একটি কক্ষ সে সময়কার মতো করেই সোফায় সাজানো। সেখানে রয়েছে ফায়ারপ্লেসও। আরেক কক্ষে পরিদর্শন বই। আর তার পাশের টেবিলে সাজানো ‘শেষের কবিতা’। রবীন্দ্র আমলের কোনো কিছুই নেই বাড়িটিতে। শুধু একটি কক্ষে রয়েছে তার ব্যবহূত খাট। ভেতরে প্রবেশ নিষেধ, তাই দূর থেকেই দেখতে হয় রবীন্দ্রনাথের খাটটি। চারপাশে কেউ না থাকায় ভেতরে প্রবেশ করে আলতো করে বিছানা ছুঁয়ে দিতেই চমকে উঠলাম। এই খাটে রবীন্দ্রনাথের স্পর্শ রয়েছে! কি নির্মল সেই অনুভূতি! যেন কবিগুরুকে প্রণামের স্বাদ।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৩৩১ বঙ্গাব্দের গ্রীষ্ফ্মাবকাশে বিশ্বভারতী বন্ধ হওয়ার সময় ছুটি কাটাতে কলকাতা থেকে কবিগুরু প্রথমবারের মতো শিলংয়ে যান। সেখানে দুই মাস অবস্থান করে, তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। বছর তিনেক পর আহমেদাবাদের ধনাঢ্য অম্বালাল সরাভাই যখন নিজের আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় কবিকে পুনরায় শিলং যেতে অনুরোধ জানান, তখন তিনি আবারও রওনা হন শিলংয়ে।
জানা যায়, শিলংয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার যে বাড়িতে ছিলেন, সেটা এখন আর অক্ষত নেই। তার মালিকানা বদলে গেছে, সেখানে এখন নতুন বাড়ি। বাড়ির মালিকের জানা রয়েছে, সেখানে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই তো সেটা স্মারক পাথরে খোদাই করে রেখেছেন। তবে বাড়ির নাম বদলে এখন হয়েছে ‘জিতভূমি’। বাগানঘেরা এ বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ‘একটি ছাউনি, একটি দিন’ লেখেন। কিছু অনুবাদও করেন। ‘শেষের কবিতা’য় এ বাড়ির বর্ণনাও রয়েছে।
দ্বিতীয়বার শিলংবাসের সময় যে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ থেকেছেন, সেটারই বর্ণনা দিয়েছিলাম কিছুক্ষণ আগে। শিলংয়ে কবিগুরুর স্মৃতিবিজড়িত আরেকটি বাড়ি লাইতুমখারার আপল্যান্ডসের সলোমন ভিলা বা সিধলি প্যালেস। সেটির এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই বলে জানা গেছে।
এরই মাঝে পাহাড়ে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে, পর দিন ভোরে নিজভূমে ফেরার তাড়াটাও শুরু। মুগ্ধ দৃষ্টিতে রবিঠাকুরের আবক্ষমূর্তির দিকে আরেকবার তাকিয়ে বিড়বিড় করেই বলে উঠলাম-
‘হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।’



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি