মঙ্গলবার ১৬ অক্টোবর ২০১৮



দিনের বেলায় রাতের আাঁধার ঢাকা শহর


আলোকিত সময় :
01.05.2018

সোমবার বেলা তখন এগারোটা। অবশ্য এর আগ থেকেই রাজধানীর আকাশ মেঘে ঢাকতে শুরু করে। সাড়ে এগারোটা বাজার আগেই চারদিকে নেমে এল ঘনকালো অন্ধকার। প্রকৃতি দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় ছিল না এটা দিনের পরিবেশ কিনা? খোদ রাজধানী ঢাকা পড়ল নিকষ অন্ধকারে। যানবাহগুলো চলছিল হেডলাইট জ্বালিয়ে। কালবৈশাখীর মেঘে ঢাকায় এমন ভুতুড়ে পরিবেশ আগে কখনও দেখা যায়নি। এরপরেই শুরু হয় কালবৈশাখীর তান্ডব। বিগত বেশ কিছুদিন যাবত এই অবস্থা চলছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন এ বছর এই মৌসুমে সাগরে নিম্নচাপ না থাকায় এবং পশ্চিম লঘুচাপের সঙ্গে পুবালী বাতাস মিশে ব্যাপক হারে কালবৈশাখী সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রকৃতিতে বৈশাখ আসার আগেই প্রকৃতিতে কালবৈশাখী সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি দু’সপ্তাহ ধরে তা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বজ্রপাতে এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে উপড়ে পড়ছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গাছপালা। ডাল ভেঙ্গে দুর্ঘটনাও ঘটছে। হঠাৎ কালবৈশাখীর কেন এ বছর বিধ্বংসী রূপ নিয়ে এমন প্রশ্নে জবাবে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন প্রকৃতির উষ্ণায়ন বৃদ্ধির রয়েছে এর পেছনে মূল কারণ। আবহাওয়া অফিসের সাবেক পরিচালক শাহ আলম  বলেন, এবারে পশ্চিমা লঘুচাপের সঙ্গে পুবালী বাতাসের সংমিশ্রণ ঘটার কারণে কালবৈশাখীর প্রকোপ অনেকে বেড়ে গেছে। তিনি জানান, এর বাইরে এ সময় সাধারণ সাগরে নিম্নচাপের জন্ম হয়। সাগরের নিম্নচাপ থাকলে কালবৈশাখীর পরিমাণ কম থাকে। কিন্তু এবার এই সময়ে সাগরে কোন নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়নি। ফলে উত্তর পশ্চিম লঘুচাপের সঙ্গে পুবালী হাওয়ার সংমিশ্রণ ঘটছে বেশি। তিনি জানান নিম্নচাপ থাকলে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে বৈশাখী ঝড়ো হাওয়া কম হয়।

তিনি এর সঙ্গে আরও যোগ করেন দেশে এক সময় খালে, বিলে এবং নদীতে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকত। ফলে মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করত। কিন্তু পানির স্তর কমে গিয়ে উষ্ণায়ন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে কালবৈশাখীর যেমন বাড়ছে। পাশাপাশি বজ্রপাতও বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে। প্রচন্ড আকারও ধারণ করছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এপ্রিলে সাধারণত সকাল বেলায় কালবৈশাখী হয় না। মে মাসে সকাল বেলায় বৈশাখী বেশি হয়। এবার কিন্তু এপ্রিলেই এটি শুরু হয়েছে। নিম্নচাপ না হওয়ায় মূলত এটি হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রকৃতিতে জলবায়ু এবং আবহাওয়া একটা পরিবর্তন সংগঠিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কারণেই একেক বছরের আবহাওয়া বিচিত্র আচরণ করছে। কোন বছর বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। আবার কোন বছর হচ্ছে না। কোন বছর ঝড়ে পরিমাণ বেশি হচ্ছে। আবার কখনও সাগরে বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি জানান, একই কারণে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। আগের চেয়ে এখন মানুষ বাড়ছে। প্রয়োজনের কারণে মানুষ ঘরের বাইরে বেশি বের হচ্ছে। এছাড়া শিল্পায়নের কারণে বড় বড় গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে। আগে বজ্রপাতগুলো গাছের ওপর বেশি পড়ত। এখন গাছপালা না থাকায় সরাসরি মানুষের ওপর পড়ছে। ঘটছে প্রাণহানি।

আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান জানান, আরও কয়েকদিন প্রকৃতিতে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাবে। তবে সামনের দিনে এর প্রকোপ কিছুটা কমে আসবে। তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ওপরের শীতল বাতাসের সঙ্গে নিচের গরম বাতাস মিশে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলেই মারাত্মক কালবৈশাখীর জন্ম নিচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু এই বছর নয় গত বছর এপ্রিলে বৈশাখী ঝড়ের প্রকোপ বেশি ছিল। আরও কয়েকদিন এ অবস্থা চলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে অব্যাহত কালবৈশাখীর কারণে প্রতিদিন আবহাওয়া অধিদফতর থেকে বিশেষ সতর্কতা বিজ্ঞপ্তি দেয়া হচ্ছে। সোমবার সকালে এ ধরনের বিশেষ সতর্কবার্তা দেয়া হয়। এতে উল্লেখ্য, সোমবার সকাল এগারোটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলসমূহের ওপর দিয়ে বজ্র-বৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে পশ্চিম/উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০-৮০ কিলোমিটার বা আরও অধিক বেগে কালবৈশাখী ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেইসঙ্গে কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য এসব এলাকার নৌবন্দরগুলোকে ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের অন্যান্য এলাকার ওপর দিয়ে ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এসব এলাকায় ২ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।

দশটায় সতর্কবার্তা দেয়ার পরই রাজধানীর ছেয়ে যায় কালো মেঘে। সাড়ে এগারোটার দিকে রাজধানী যেন অন্ধকারময় একটা নগরীতে পরিণত হয়। এরপর শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি আর ঝড়ো হাওয়ায়। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ো হাওয়া। তবে এক ঘণ্টার মধ্যে আবার মেঘ পরিস্তার হয়ে রোদের দেখা মেলে। আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। বিকেলে পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় ছিল না দুপুরে রাজধানীর আকাশ ছেয়েছিল ঘনকালো আকাশে।

দুপুরে ঝড়ো বাতাসের সঙ্গে শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টিপাত। মানুষগুলো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকে। অনেকে ছাতা ফুটিয়ে বৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা করেন। অনেকে আশ্রয় নেন রাস্তার পাশে অবস্থিত বড় বড় ভবন দোকানপাটের নিচে। মোটরসাইকেল আরোহীদের অনেকেই কষ্টটা ছিল ভিন্ন রকমের। যাদের রেইনকোট ছিল, তারা নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু যাদের ছিল না, তারা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে ভিজেছেন অসহায়ের মতো। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এ সময় বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ফলে বিমানবন্দরে অনেক যাত্রীকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে।

সোমবারের দুপুরের ঝড়ো হাওয়ার কারণে রাজধানীর সচিবালয়ের সামনে রাস্তার দুই ধারে থাকা মেহগনি গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। ভেঙ্গে পড়া গাছের ডালপালা পড়েছিল সামনের সড়কেও। ফলে যানচলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হয়। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে ভেঙ্গে পড়া গাছ ও তার ডালপালা। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সদরঘাট থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচল সাময়িক বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। অবশ্য আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় পুনরায় নৌযান চলাচল শুরু করে। ঢাকা নদী বন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বেলা এগারোটা থেকে নৌ-চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

 



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি