মঙ্গলবার ১৪ অগাস্ট ২০১৮



নাগেশ্বরীতে স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুলের নামে কোটি টাকা বাণিজ্য


আলোকিত সময় :
10.04.2018

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ঃ

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় নাম সর্বস্ব ‘আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থার’ ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুল’ শিক্ষা প্রকল্পের নামে স্কুল খুলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংস্থাটি নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক স্কুল খুলে প্রতিটিতে পাঁচজন করে শিক্ষক ও একজন করে আয়া নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। শিক্ষকদের নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে ‘স্বপ্ন ফাউন্ডেশন এন্ড বুটিক হাউস’ নামক প্রতিষ্ঠানের প্যাডে। ঠিকানা রয়েছে; হাউজ নং-৭৫, রোড নং-১৩, সেক্টর-১৯, উত্তরা ঢাকা। নিয়োগ পত্রের মর্মানুযায়ী প্রধান শিক্ষক প্রতিমাসে ১৪ হাজার, সহকারি শিক্ষক ১২ হাজার ও আয়া পাবেন ৮(আট) হাজার টাকা। নিয়োগদাতা আজিজার রহমান জেলা সমন্বয়কারী কুড়িগ্রাম।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, প্রতিজন শিক্ষকের নিকট থেকে ১০-৫০হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। চাকুরীর আশায় এসব টাকা তুলে দিয়ে নিয়োগপত্র নিয়েছেন স্কুলে কর্মরত শিক্ষকরা।
জানতে চাইলে নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসলেম উদ্দিন শাহ প্রকল্প সম্পকে কিছুই জানেন না বলে জানান।
বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ছিট মালিয়ানী স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুলে গিয়ে দেখা যায় ৩০জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন একজন শিক্ষক। বসে আছেন আরও চারজন শিক্ষক ও একজন আয়া।
শিক্ষকরা জানান, ১জানুয়ারী থেকে তারা পাঠদান চালাচ্ছেন কিন্তু তিন মাসেও বেতন পাননি। শিক্ষার্থীদের পোশাক, দুপুরে খাবার ও দৈনিক ১৫ টাকা হারে বৃত্তির টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তিন মাসে একটি টাকাও দেয়া হয়নি। শুধু একটি করে বই ও একটি ¯েøট দেয়া হয়েছে।
ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, আশার আলোতে যোগাযোগ করে কিছু টাকা দিয়ে স্কুল শুরু করেছি।
সহকারি শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার সুমী বলেন, আমরা নিয়মিত ক্লাশ নিচ্ছি। তিন মাস পার হলেও বেতন পাইনি।
একজন শিক্ষক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ৩০হাজার টাকা দিয়ে নিয়োগ নিলেও তিন মাসেও বেতন পায়নি। এখন শুনছি প্রকল্পটি ভুয়া।
এলাকাবাসী আবু তাহের জানান, তার এলাকায় ১০-১২টি নতুন স্কুল খুলে প্রতিজন শিক্ষকের নিকট থেকে ১৫ হাজার থেকে ৪০হাজার করে টাকা নিয়েছে। প্রতি মাসে স্কুল ঘর ভাড়া বাবদ দুই হাজার টাকা দেয়ার কথা থাকলেও কেউ ভাড়া পায়নি।
স্থানীয় ভাবে জানা যায়, আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থা ২০১৭সালের শুরুতে স্বপ্ন ফাউন্ডেশন শিশু শিক্ষা প্রকল্পের নাম করে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রথম দফায় স্কুল প্রতি ৩০-৫০হাজার টাকা নিয়ে ২৩টি স্কুল অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডল বিভিন্ন এলাকায় তার নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০-৫০হাজার টাকা নিয়ে সরাসরি শিক্ষক ও আয়া নিয়োগ দেন।
নাগেশ্বরী পৌরসভার পায়ড়াডাঙ্গা বালাশীপাড়া স্বপ্ন ফাউন্ডেশন স্কুলের সহকারি শিক্ষক রওশনারা বেগম বলেন, বানুরখামার এলাকার খলিলুর রহমান ১০হাজার টাকা নিয়ে স্কুলে আমাকে চাকুরি দেয়। তবে তিন মাস হলেও এখনও নিয়োগপত্র পাইনি।
পৌরসভার মাজারপাড়া স্কুলে দেখা মেলে প্রকল্প পরিদর্শক নবীবুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলমের। নবীবুর রহমান বলেন, আমার কাজ স্কুল দেখভাল করা। বেতনের বিষয় বলতে পারবো না। স্কুলগুলো কয়েকবার অডিট হয়েছে; আর একবার অডিট করে বিস্কুট ও বেতন দেয়ার কথা।
একজন প্রকল্প পরিদর্শক নাম না বলার শর্তে জানান, এক থেকে দেড় লাখ টাকা করে দিয়ে উপজেলায় ছয় জন পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
পূর্বসূখাতী এলাকার আলমগীর হোসেন বলেন, আমি এলাকায় একটি স্কুল খোলার প্রস্তাব নিয়ে অফিসে গেলে আমাকে জানানো হয় স্কুল শেষ তবে দু’দিনের মধ্যে ১লাখ টাকা দিলে স্কুল দেয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে আশার আলো পল্লী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডল জানান, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার জন্য এ প্রকল্প। নেদারল্যান্ডের একটি দাতা সংস্থা আমার সংস্থায় অর্থায়ন করবে। তাদের সাথে চুক্তি করেছে ঢাকার স্বপ্ন ফাউন্ডেশন ও বুটিক হাউজ। আমরা তৃতীয় পক্ষ। তিনি দাবী করেন নাগেশ্বরী উপজেলায় তার অধিনে ৪৮টি স্কুল রয়েছে। বাকিগুলো অন্যকেউ করতে পারে। টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করে আজিজার রহমান মন্ডল বলেন, আমি সরাসরি কারও কাছ থেকে টাকা নেইনি। আমার কাছ থেকে যারা স্কুল নিয়েছে তারা প্রতিজন শিক্ষকের নিকট থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার করে টাকা নিয়েছে এটা আমি জানি।
এব্যাপারে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসলেম উদ্দিন শাহ বলেন, এরকম কোন কার্যক্রমের চিঠি আমি পাইনি। দেশি-বিদেশী যাই হোক উপজেলায় শিক্ষা প্রকল্প হলে শিক্ষা বিভাগ সেটা জানার কথা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শঙ্কর কুমার বিশ্বাস জানান, তিন মাস আগে কয়েকজন ব্যক্তির নিকট থেকে বিষয়টি জেনে আশার আলো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আজিজার রহমান মন্ডলসহ তার লোকজনকে অফিসে ডেকে এনে কি প্রকল্প জানতে চাইলে তারা প্রকল্পের কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি