বুধবার ১৮ জুলাই ২০১৮



ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণে স্থবিরতা


আলোকিত সময় :
18.03.2018

ব্যাংকগুলোতে ঋণ বিতরণে স্থবিরতা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। মূলধন ঘাটতিতে বিঘিœত হচ্ছে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম। ঋণ বিতরণে স্থবিরতা কাটাতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মূলধন সংকটে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক মান বা ব্যাসেল-৩ মানে উন্নীত করতে ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগাতে হচ্ছে। তবে প্রতিবছর ঋণ সহায়তা না দেওয়ার পরমর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতি বছর মূলধন জোগান দেওয়া ঠিক নয়। যারা ঘাটতির জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কাক্সিক্ষত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো আশঙ্কাজনক মাত্রায় মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। মূলধন ঘাটতিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ হচ্ছে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব এবং সভরেন রেটিং-এ বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জানা গেছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পৃথকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে এ টাকা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি মূলধনের পরিমাণ ২ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঘাটতি সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া রূপালী ব্যাংক ৭০০ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ১ হাজার ২৭২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি মূলধন ৮০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, এ বছর ঋণ সহায়তা না পেলে কোনো কোনো ব্যাংকের এলসি খোলাও সম্ভব হবে না। শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এ ঘাটতি থেকে উত্তরণের জন্য স¤প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে। তাতে কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। ঐ বৈঠকে সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো ২০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন সুবিধা দাবি করে। মূলত আপৎকালীন সংকট মেটাতেই এই ঋণ সুবিধা চেয়েছে তারা। শুধু সোনালী ব্যাংকই ঋণ সহায়তা হিসাবে চেয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থা শুধু সরকারি ব্যাংকে নয়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

সোনালী ব্যাংক ছয় হাজার কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চেয়ে গত ৪ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে। বিশেষ গ্যারান্টি নামে এই ঋণ সহায়তা পেলে ব্যাংক বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল­াহ আল মাসুদ বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ এর শর্ত পূরণ করতে হলে যে তহবিল প্রয়োজন সে টার্গেট থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। সে কারণেই আমরা বিশেষ গ্যারান্টি চেয়েছি। গ্যারান্টি না দিলেও আমরা সরকারি ব্যাংক হিসাবে গ্যারান্টেড।

সূত্রমতে, ব্যাসেল-৩ ব্যাংকিং গাইডলাইনের সাথে সঙ্গতি রেখে সর্বনিæ মূলধন বজায় রাখতে না পারলে বিদেশি ব্যাংক এলসি (ঋণপত্র) নিতে নিরুৎসাহ দেখাবে। তাতে দেশেরও ইমেজ ক্ষুন্ন হবে। এটি একটি জাতীয় ইস্যু। তাই আপত্কালীন সময়ের জন্য ন্যূনতম মূলধন নিশ্চিত করতে বিশেষ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এটি ব্যাংকের ‘জীবন রক্ষায়’ এবং দেশের ‘সম্মান রক্ষায়’।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো ব্যাংকের পতন হয় না। আমাদের সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতি হতে দেব না। যে ভাবেই হোক আমরা ব্যাংক রক্ষা করবো। তিনি বলেন, সরকার অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকেও অর্থ সহায়তা দেবে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়েছে। মূলধন ঘাটতি পূরণে ২০০৫-০৬ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সরকার ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকার পুনঃমূলধনীকরণ সুবিধা দিয়েছে। এবারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, জরুরি ভিত্তিতে এই ঋণ সহায়তা দেওয়া হবে। যাতে করে বিদ্যমান সংকট উত্তরণ ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতের ফারমার্স ব্যাংকে অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়। ফারমার্স ব্যাংক ঠিক করতে সরকার ইতোমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ার কেনার প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে ঐ চার ব্যাংক বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেবে। এ বাবদ ফারমার্স ব্যাংক পাবে ১১শ’ কোটি টাকা।

সাবেক অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান বলেন, মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকার প্রতি বছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে টাকা দিচ্ছে। কেন মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোকে অর্থ জোগান দিতে হবে। কারা এর জন্য দায়ী তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করা হলে নাম না বলার শর্তে কয়েকটি ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা এখন বড় কোনো ঋণ বিতরণ করছি না। ছোট-খাটো কিছু ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে এসএমই লোনের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিগত সময়ের বিতরণকৃত ঋণ রিভাইজের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, অর্থ সংকট যে নেই তা বলবো না। তবে আরও কিছু দিন পর বড় ঋণ বিতরণের দিকে যেতে পারবো।

বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা রাষ্টায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের কাছে ঋণ সহয়তা পেতে যোগাযোগ করছেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল­াহ আল মাসুদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঋণ চেয়ে সোনালী ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছেন। আমরা চেষ্টা করছি যতটুকু সম্ভব তাদের চাহিদা মেটাতে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি