বৃহস্পতিবার ১৬ অগাস্ট ২০১৮



নিম্নমানের পাওয়ার টিলার কিনে ভোগান্তিতে কৃষকরা


আলোকিত সময় :
13.03.2018

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : অতীত হয়ে যাচ্ছে গরু দিয়ে হালচাষ। ডিজিটালের ছোঁয়া লেগেছে কৃষি কাজেও। আধুনিক যন্ত্রপাতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে কৃষকরাও। জমি চাষ থেকে শুরু করে ধান রোপন, ধান কাটা ও মাড়াই, গম কাটা ও মাড়াইসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। দ্রুত কাজ হওয়ার কারণে কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন কৃষকরা। কৃষি এ যন্ত্রপাতির সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও কম নয়। কৃষকদের আগ্রহের কারণে কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন কোম্পানি নিন্মমানের ইঞ্জিনচালিত মেশিনারিজ তৈরী করছেন। আর এ সব নিন্মমানের মেশিন কিছু দিন যেতে না যেতেই নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন পার্স। আর্থিক ক্ষতির সাথে দূর্ভোগে পড়তে হচ্ছে কৃষকদের। আবার এসব কৃষি যন্ত্রপাতি কিনে বিক্রয়োত্তর সেবাও পাচ্ছেন না তারা। এ যেন লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাওয়ার দশা।

জানা গেছে, চাষাবাদের ক্ষেত্রে কৃষকের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় পাওয়ার টিলার। যন্ত্রটি কৃষকের ক্রয় ক্ষমতার নাগালে আনতে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিও দিচ্ছে সরকার। তবে যন্ত্রটি কিনে প্রায় প্রতারিত হচ্ছেন কৃষক। বিক্রয়ের পর কোম্পানির পক্ষ থেকে বিক্রয়োত্তর সেবা না দেয়ায় বিপাকে পড়ছেন তারা। অপরদিকে এ বিষয়ে যথাযথ নীতিমালা না থাকায় ব্যবস্থাও নিতে পারছে না স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার শহিদুল ইসলাম নামের এক কৃষক এক বছর আগে ডংফেং কোম্পানির স্থানীয় ডিলারের মাধ্যমে পাওয়ার টিলার কিনেছিলেন। কেনার পর বিয়ারিং, চেইন, ইয়ার ক্লিনার, পিছনের চাকা পরিবর্তন করতে হয়েছে। লোকাল মার্কেট থেকে এসব যন্ত্রপাতি কিনতে হয়েছে তাদের। কোম্পানির কোনো সার্ভিসিং সেন্টার না থাকায় একদিকে বাড়ছে ভোগান্তি অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতি।

একই অবস্থা নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পলাশ মিয়ার। ৮ মাস আগে সাইফেং কোম্পানির পাওয়ার টিলার কিনে গত ২ মাসে তিনবার চেইন পরিবর্তন করেছেন। গাড়ির চেসিস ভেঙে যাওয়ায় সেটিও পরিবর্তন করতে হয়েছে। গত ৮ মাসে পাওয়ার টিলার দিয়ে ৭০ হাজার টাকা আয় করেছেন। কিন্তু মেরামত করতেই খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। আর যন্ত্রটি মেরামতে ডিলার কিংবা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কোনো সহযোগিতা পাননি তিনি। তিনি বলেন, সময় ও শ্রমিক সাশ্রয়ের জন্য পাওয়ার টিলারসহ ধান কাটা ও মাড়াই মেশিন কিনেছিলাম। কিন্তু ঘন ঘন নষ্ট হওয়ায় ভোগান্তির সাথে বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি। এ পরিস্থিতি উত্তোরণের জন্য আমি সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা কামনা করছি।
বগুড়া পল­ী উন্নয়ন একাডেমি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের যৌথ জরিপের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত পাওয়ার টিলারের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার পাওয়ার টিলার আমদানি করা হচ্ছে। পাওয়ার টিলারের বাজারে ৭০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে চিটাগাং বিল্ডার্স লিমিটেড। ২০১৬ সালে ৪২০ কোটি এবং ২০১৭ সালে সাড়ে চারশ কোটি টাকার পাওয়ার টিলার বিক্রি হয়েছে। আর দেশের বাজারে ৭০ শতাংশের বেশি দখল রয়েছে চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি লিমিটেডের। এর বাইরে কিছু প্রতিষ্ঠান পাওয়ার টিলার আমদানি করে থাকে।

এ বিষয়ে চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি লিমিটেডের মহাব্যস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের পাওয়ার টিলারের এক বছরের ওয়ারেন্টি আছে। কোনো ক্রেতা যদি ডিলার পয়েন্ট এসে অভিযোগ করে তবে সেখানেই সেবা দেয়া হচ্ছে। সম্ভব হলে বাড়িতেও দেয়া হচ্ছে। তবে অন্য কোনো কোম্পানির মেশিনে বিক্রয়োত্তর সেবা দেয়া হয় না।

এ বিষয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম পাওয়ার অ্যান্ড মেশিনারি বিভাগের অধ্যাপক মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, সার্বিকভাবে কৃষিতে শ্রমিক সংকট ও উৎপাদন বাড়াতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। সঠিক যন্ত্র যেমন কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে তেমনি সেটির বিক্রয় পরবর্তী সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রয় করবে তাদের অবশ্যই বিক্রয়োত্তর সেবা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। তা না হলে কৃষকরা যন্ত্রপাতি ব্যবহারে আগ্রহ হারাবে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে দক্ষ কারিগর তৈরিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। সরকারের উচিত সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি