বৃহস্পতিবার ১৮ অক্টোবর ২০১৮



ব্যাংক-শিক্ষাখাত নিয়ে অস্বস্তিতে নীতি-নির্ধারকরা


আলোকিত সময় :
19.02.2018

রমজান আলী  : ব্যাংক ও শিক্ষাখাত নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা। টানা কয়েক বছর ধরে চলছে ব্যাংকে অনিয়ম আর দুর্নীতি। আর একই পরিস্থিতি শিক্ষাখাতেও। এবারকার এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের। পরীক্ষার প্রায় সব বিষয়ের প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে, তবুও পরীক্ষা থেমে থাকেনি। এতে করে বিব্রত বিবেক। লজ্জিত হয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সকলেই। দেশের সব মহলের এখন একটিই প্রশ্ন, প্রশ্ন ফাঁস কি বন্ধ হবে না ? সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এসে ব্যাপক সমালোচনার মুখে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে একের পর এক দুর্নীতি আর প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে জাতীয় সংসদসহ সারাদেশে সমলোচনার ঝড় উঠেছে দুই মন্ত্রীকে নিয়ে। আর এতে সরকার অস্বস্তিতে পড়েছে।

সরকারের দুই মেয়াদেই অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত দায়িত্বপালন করেন। তার মেয়াদে দেশে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে, শেয়ারবাজারের, হলমার্ক, বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিসহ দেশে বড় বড় কয়েকটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এছাড়া বেফাঁস কথা বলে প্রায়ই সমালোচিত হয়েছেন তিনি।

এছাড়া সরকারের ৯ বছরে দেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে । কিন্তু এবার শেষ মেয়াদে এসে শিক্ষায় সর্বোচ্চ প্রশ্নপত্র ফাঁসের রের্কড ভেঙেছে । তাই জাতীয় সংসদ থেকে রাজপথে সর্বত্র শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের জোর দাবি উঠেছে। তাই সব দিক মিলিয়ে দুই মন্ত্রীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনা ও দুর্বলতা এবং ব্যাংক খাতে কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে বারবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন সরকার। এছাড়া তিনি আরো বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে ‘হরিলুট’ হচ্ছে এমন মন্তব্য করেন তিনি। এক পরিবারের ছয়জনকে পরিচালক করার সুবিধা দিয়ে করা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী আইনের ইতিহাসে একটি ভয়ঙ্কর নজির হয়ে থাকবে। ব্যাংক খাতে নৈতিকতার সংকট চলছে। ব্যাংক পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলো কাগুজে প্রফিট দেখাচ্ছে।

গত রবিবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সমালোচনা করে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু ও কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। লুটপাটের মাধ্যমে টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। আজ অর্থনীতির রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অর্থনীতির রক্তক্ষরণের কারণে জাতির রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পানামা পেপার, প্যারাডাইস পেপার কেলেঙ্কারির মাধ্যমে অর্থনীতিকে দুর্বল করা হচ্ছে।

জিয়া উদ্দিন আহমেদ বাবলু আরো বলেন, পানামা পেপার, প্যারাডাইস প্যাপারে তো কোনো রাজনীতিবিদের নাম আসেনি। ভয় কীসের? আজ এখানে যারা ট্রেজারি বেঞ্চে (সরকারি দলের সদস্য) আছেন, আমরা বিরোধীদলে আছি। সুশীল সমাজের অনেকে অনেক কথা বলেন। আজ তো আমাদের নামে কোনো অ্যাকাউন্ট বের করতে পারেনি, তাদের নামেই বেরিয়ে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা টাকা পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। প্যারাডাইস পেপার ও পানামা পেপারে যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন, জাতি আপনাকে সাধুবাদ জানাবে।

সম্প্রতি রাজধানীর হোটেল লা মেরিডিয়ানে অগ্রণী ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যাংক নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার তা অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে বলেন, বাংলাদেশের বড় অংশের মধ্যে ব্যাংকের বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। মানুষের ধারণা ব্যাংক মানেই অনিয়মের আখড়া। ব্যাংক খাত নিয়ে সাধারণের মধ্যে এমন ধারা থাকায় সরকার এক ধরনের অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। মন্ত্রী, এপিদের নানা জবাবদিহিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

একই অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ব্যাংকিং খাত নিয়ে আমরা যথেষ্ট অস্বস্তির মধ্যে আছি। এ খাত নিয়ে অনেক জবাবদিহিতার মধ্যে পড়তে হয়। এ অবস্থা থেকে ওঠে আসতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের রেগুলেটরি অত্যান্ত দুর্বল। পুরস্কারের পাশাপাশি তিরস্কারের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আপনারা (ব্যাংকার) যেভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন, সেই হারে সেবাটা আমরা পাচ্ছি না।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে ‘হরিলুট’ হচ্ছে। এক পরিবারের ছয়জনকে পরিচালক করার সুবিধা দিয়ে করা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী আইনের ইতিহাসে একটি ভয়ঙ্কর নজির হয়ে থাকবে। ব্যাংক খাতে নৈতিকতার সংকট চলছে। ব্যাংক পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকগুলো কাগুজে প্রফিট দেখাচ্ছে।

ফখরুল ইমাম বলেন প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আরো বলেন, চলমান এসএসসি পরীক্ষার সাতটি বিষয়ের সবগুলোরই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এটি এখন সরকারের নাগালের বাইরে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস ও ঋণ কেলেঙ্কারির প্রভাব পড়ছে সরকারের উপর। আর এসব অপরাধের শাস্তি হয় না বলেই সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, এ ঘটনায় দেশের সুশীল সমাজ যেমন লজ্জিত তেমনি লজ্জিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। বিব্রত জাতির বিবেক। দেশের সব মহলেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, প্রশ্ন ফাঁস কি রুখবার নয়?

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে শেষপর্যন্ত এই অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট উদ্যোগ নিতে হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। তবে শিগগিরই প্রশ্ন ফাঁসের মূলহোতাকে ধরা হবে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি