সোমবার ১৮ জুন ২০১৮



আমানতকারী ভাগিয়ে নিতে তৎপর ব্যাংক কর্মকর্তারা


আলোকিত সময় :
19.02.2018

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : এখন ঋণের গ্রাহক নয়, উচ্চসুদে অন্য ব্যাংকের আমানতকারী ভাগিয়ে নিতে তৎপর ব্যাংক কর্মকর্তারা। ঋণ বিতরণ বন্ধ রেখে আমানতের জন্য গ্রাহকদের অফিসে কিংবা বাড়িতেও ছুটছেন তারা। দেশের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকই গ্রাহকদের দুই অংকের ঘরে এমনকি ১২ শতাংশ পর্যন্ত সুদে আমানত রাখার প্রস্তাব দিচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমানত রাখলে উচ্চসুদের পাশাপাশি উপঢৌকনও দিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো।

শুধু গ্রাহক নয়, বরং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আমানতের এ সংকটকে কাজে লাগাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক। মেয়াদি আমানতের জন্য ১০ শতাংশের বেশি সুদ চাইছে এ ব্যাংকগুলো। এর চেয়ে বেশি সুদ দেয়ার প্রস্তাব করলেও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে আমানত দিতে রাজি হচ্ছে না সোনালী ব্যাংক। সোনালী ব্যাংক থেকে আমানত নেয়ার জন্য ভিড় করছে বেসরকারি খাতের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলোও। এ তালিকায় আছে ইস্টার্ন, ব্র্যাক, দ্য সিটি, সাউথইস্ট, ঢাকা ব্যাংকের মতো প্রথম সারির বেসরকারি ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকগুলো শুধু সোনালী ব্যাংক থেকেই সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার মেয়াদি আমানত ধার নিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংক মিলিয়ে ধার দেয়া মেয়াদি আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।

তারল্য সংকট পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে আমানত সংকটের বিদ্যমান পরিস্থিতি নজিরবিহীন। দুই অংকের সুদহার প্রস্তাব করেও গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক এডি রেশিও (ঋণ ও আমানতের অনুপাত) কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়েই আমানত নিয়ে এ কাড়াকাড়ি বলে জানান তিনি।
দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো বিনিয়োগের উদ্বৃত্ত টাকা অন্য ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা রাখে। এর বিপরীতে ৫-৭ শতাংশ সুদ পেয়ে আসছিল জমা রাখা ব্যাংকগুলো। কিন্তু আমানতের তীব্র সংকট তৈরি হওয়ায় এখন ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংককে ধার দেয়া আমানত তুলে নিচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত কম পাওয়া ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।

আমানতের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহারও বাড়িয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের ঋণের সুদহারই এখন গড়ে ১৩ শতাংশের উপরে চলে গেছে। ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্ষুব্ধ হলেও খুশি আমানতকারীরা। বহুদিন পর ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে মূল্যায়ন পেয়ে ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত হচ্ছেন তারা। আমানতের সুদহার বাড়ায় খুশি বাংলাদেশ ব্যাংকও।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিন বছর ধরে ব্যাংকগুলো বাছবিচার ছাড়াই আমানতের সুদহার কমিয়েছিল। কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংক আমানতের সুদহার ২ শতাংশেরও নিচে নামিয়ে এনেছিল। এ পরিস্থিতিতে আবার আমানতের সুদহার বাড়ায় আমানতকারীরা ব্যাংকমুখী হচ্ছেন।

এটিকে পক্ষপাতমূলক হিসেবে দেখছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির ৭০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ সরকারি আমানতের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় রাখা হচ্ছে। এটিকে ৫০ শতাংশ করা দরকার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছে। ফলে আমানতের সংকট আরো বেশি তীব্র হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় সরকারি আমানত বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। গভর্নরের কাছে আমরা সহযোগিতা চেয়েছি। বিষয়টি তিনি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।

চলতি বছরের শুরুতে দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অলস থাকা এ তারল্যের সিংহভাগই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকে। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও কমিয়ে সাধারণ ব্যাংকের জন্য সর্বোচ্চ ৮৩ দশমিক ৫০ ও ইসলামী ধারার ৮৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি