শুক্রবার ১৬ নভেম্বর ২০১৮



কৃষি ব্যাংককে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার অংশীদার করতে চাই : চেয়ারম্যান


আলোকিত সময় :
09.01.2018

২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চলছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রধান কাজ হলো বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কৃষকদের মধ্যে কৃষিঋণ বিতরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা থেকে উন্নিত করে চলতি বছর ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী বছর এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে ১৫ হাজার কোটি টাকা করা হবে। কৃষি ব্যাংককে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার অংশীদার বানাতে চায়। দৈনিক আলোকিত সময়ের সাথে একান্ত সাক্ষাতে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান ও রমজান আলী

২০১৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করে আসা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল এর সাক্ষাতকারটি নিæে দৈনিক আলোকিত সময়ের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
আলোকিত সময়: মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে কৃষি ব্যাংকের ভ‚মিকা কী?
মোহাম্মদ ইসমাইল: ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা চলছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রধান কাজ হলো বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সে কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করছে। আমরা গ্রাহকদের সহায়তায় কৃষি ব্যাংককে মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার অংশীদার বানাতে চাই।
আলোকিত সময়: গত বছর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে কী?
মোহাম্মদ ইসমাইল: বিগত দুই আগেও কৃষি ব্যাংকের ঋণ বিতরণের লক্ষমাত্রা ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থা দীর্ঘদিন যাবত চলে আসছিল। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাকে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিই। সে লক্ষ্যে গত ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রার ৮৭ শতাংশ অর্থাৎ ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হলো লোকবলের অভাব। তবে বর্তমানে সংকট অনেকটা পূরণ হয়েছে। বাকি লোকবল নিয়োগের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে কথা হয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছি।
আলোকিত সময়: চলতি বছর ঋণ বিতরণের লক্ষমাত্রা কত?
মোহাম্মদ ইসমাইল: চলতি ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ঋণ বিতরণের লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে কৃষিতে ৫ হাজার ৫০০ কোটি, এসএমই খাতে এক হাজার ৪০০ কোটি আর বাকি টাকা ইন্ডস্ট্রির বিভিন্ন সেক্টরে বিতরণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষিতে ৯ শতাংশ ও ইন্ডস্ট্রি লোনে ১১ শতাংশ ইন্টারেস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কৃষি ব্যাংক গরু পালনের উপর জোর দিয়েছে। গরু পালনে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হবে। গোটা দেশে কৃষি ব্যাংকের এক হাজার ৩১টি শাখা রয়েছে। প্রত্যেক শাখা প্রধানদের ঋণ বিতরণের ক্ষমতা দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে। এবং প্রত্যেককে তাদের হিস্যা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসাথে ঋণ দেওয়া এবং নেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে। তবে ব্যাড লোনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের আগামী বছর এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে ১৫ হাজার কোটি টাকা করা হবে।
আলোকিত সময়: ঋণ বিতরণে কোন খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?
মোহাম্মদ ইসমাইল : কৃষি ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বেশি গ্রাহকের ব্যাংক। এ জন্য গ্রাহকরা যে খাতে ঋণ নিতে আগ্রহী ব্যাংক নিয়ম মেনে তা দিতে বাধ্য। ব্যাংকের কাজই গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা। তারপরও আমরা ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কৃষি পণ্যকে অগ্রধিকার দিচ্ছি। ধান, কলা, ভুট্টা, পাট থেকে শুরু করে কমলা, মাল্টাসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্যে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। গ্রাহকদের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা জমির মিউটেশন (খারিজ) না করা। এটা করতে গিয়ে অনেক কৃষক হয়রানি ও ঘুষ দেওয়ার ভয় পান। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখন এক মাসের মধ্যে কাজ করে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কৃষির পাশাপাশি এসএমই খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা এর জন্য আলাদা বরাদ্দ রেখেছি। এ ছাড়া ইন্ডাস্ট্রিতেও ঋণ দেওয়া হচ্ছে। তবে গবাদি পশু পালনে সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রজেক্টে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থায়ন করছে। আমাদের ব্যাংকের হিস্যা কম হওয়ায় এ খাতে খুব বেশি সংখ্যক উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে পারছি না।
আলোকিত সময়: খেলাপি ঋণ নিয়ে কিছু বলুন?
মোহাম্মদ ইসমাইল: খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের অগ্রগতি হয়েছে। ধীরে ধীরে কমে আসছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২৮ শতাংশ। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে তা কমে ৩৯ হাজার কোটি টাকায় এসেছে। যা বিতরণকৃত ঋণের ২২ শতাংশ। খেলাপি ঋণের হার কৃষি ও কারখানায় সমান সমান। চলতি বছর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০ শতাংশের নীচে আনার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পেইড অব ক্যাপিটাল এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা। আর মূলধন ঘাটতি রয়েছে ৭ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা।
আলোকিত সময়: কৃষি ব্যাংকে কী পরিমাণ রেমিটেন্স এসেছে?
মোহাম্মদ ইসমাইল: ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিটেন্স এসেছিল এক হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে রেমিটেন্স আসার পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এ বছর রেমিটেন্স আসে এক হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রেমিটেন্স এসেছে ৬৫০ কোটি টাকা। এ বছর রেমিটেন্স আসার পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করছি।
আলোকিত সময়: এ পর্যন্ত কোন কাজটি করে আপনি সন্তুষ্ট?
মোহাম্মদ ইসমাইল: গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো ব্যাংকের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় ছিল। কেননা দীর্ঘদিন ধরে এটা ৫ হাজারের কোটা অতিক্রম করছিল না। বর্তমানে ঋণ বিতরণের টার্গেট ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করতে পারায় আমি কিছুটা সন্তুষ্ট একথা বলা যেতে পারে। এখন আমাদের কাজ হলো কস্ট অব ফান্ড কমিয়ে ইনভেস্ট বাড়ানো। ব্যাড লোনও কমিয়ে আনতে হবে। আমরা অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাথে সমান্তরালভাবে এগিয়ে যেতে চাই।
আলোকিত সময়: কৃষি ব্যাংক নিয়ে আপনার পরিকল্পনার কথা বলুন?
মোহাম্মদ ইসমাইল: ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে ন্যাশনাল লেভেলে আনতে চাই। এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়িয়ে তা সঠিকভাবে আদায় করবো। কোনভাবেই ঋণ ডিফোল্ডার হতে দেওয়া হবে না। সে বিষয়টিই গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
উলে­খ্য কৃষিঋণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় বিশেষায়িত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য এ ব্যাংকের সৃষ্টি। দেশে কৃষিঋণের সিংহভাগই কৃষি ব্যাংকের অবদান। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কৃষি খাতের জন্য একটি বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংক হলেও এটি অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো সব ধরনের ব্যাংকিং কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকে। কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিময়ব্যবসা, বাণিজ্যিক ও কৃষিভিত্তিক শিল্প/প্রকল্প, প্রকল্পের চলতি মূলধন, এসএমই, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, মাইক্রো ক্রেডিট, কনজ্যুমার ক্রেডিট এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকান্ডসহ বিভিন্ন খাতে এ ব্যাংক ঋণ সহায়তা প্রদান করে থাকে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দুইদফা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচি সরকারসহ সকল মহলে প্রশংসিত হয়।
এ ব্যাংকের ৩৫ লাখেরও বেশি ঋণগ্রহীতা রয়েছে। আর দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাঙা করতে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসার খোলার সুযোগ পেয়েছে ৭০ লাখ কৃষক। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার কারণেই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষি ব্যাংক অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি