সোমবার ১৮ জুন ২০১৮



জনগণের পুষ্টির অভাব দূরীকরণে সচেষ্টা নিতে হবে


আলোকিত সময় :
07.10.2017

চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী শরীর গঠন, বুদ্ধিমত্তা, শরীর বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য; শারীরিক শক্তি বা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য; জীবন চক্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময় যেমন- শিশুকাল, শৈশবকাল, কৈশোর, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদানকাল ও বয়োসন্ধিকালে বিশেষ প্রয়োজনীয়, পরিমিত ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক অবস্থা ও দৈহিক ক্রিয়াকর্ম অনুযায়ী খাদ্য চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা কম কিংবা অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ অপুষ্টিজনিত রোগের কারণ হতে পারে। তাই জীবনের সকল পর্যায়ে আমাদের পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ করা খুবই জরুরি। কিন্তু দেশের জনগণের পুষ্টিস্তর সন্তোষজনক নয়। দক্ষ জাতি গঠনের লক্ষ্যে জনগণের পুষ্টির অভাব দূর করা দরকার। এজন্য সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর এদিকে নজর দিতে হবে।

দৈনিক আলোকিত সময়ের খবরে প্রকাশ, সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি বিষয়ে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে এখন প্রায় আড়াই কোটি মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। গত ১০ বছরে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৭ লাখ। দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে স্থ‚লতার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে শিশু ও নারীর পুষ্টি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), জাতিসংঘের কৃষি উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (ইফাদ), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি), জাতিসংঘ শিশু সংস্থা (ইউনিসেফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এফএওর প্রধান কার্যালয় ইতালির রাজধানী রোম থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ। বর্তমানে বিশ্বে ৮১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়। বিশ্বের সব কটি দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি তুলে ধরতে প্রতিবছর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০০৪-২০০৬ সালে বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার মানুষ ছিল ২ কোটি ৩৭ লাখ। এখন ২ কোটি ৪৪ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ১৫ দশমিক ১ শতাংশ। ১০ বছর আগে এটি ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। অপুষ্টির শিকার মানুষের মোট সংখ্যা বাড়লেও জনসংখ্যার অনুপাতে কমেছে। তবে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা কমার হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ধীর। ভারতে অপুষ্টির শিকার মানুষের হার ২০০৬ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে কমে হয় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও মিয়ানমারে অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগা মানুষের হার কমছে বাংলাদেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে।

বিগত কয়েক বছরে, বাংলাদেশ মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যে উলে­খযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিশেষ করে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ প্রসব ব্যবস্থা আর শিশুদের মৃত্যুর ক্ষেত্রে অগ্রগতি অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) এর সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক প্রাথমিক জরিপে এ তথ্য জানা যায়। জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ৪৬-এ হ্রাস পেয়েছে। এক বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যু হার ৩৮-এ হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনো দেশে প্রতি ২২ জন শিশুর মধ্যে একজন পাঁচ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করে। দেশে বর্তমানে খর্বকায় শিশুর হার ৩৬ শতাংশ, কম ওজনের শিশুর হার ৩৩ শতাংশ। গর্ভবতী মায়েদের চারবার গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হারও দ্বিগুণ বেড়েছে। তারা সবাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করে থাকেন। তা ১৭ শতাংশ থেকে এই হার ৩১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে এখনো প্রতি ১০ জন গর্ভবতীর মধ্যে মাত্র তিন জন পরামর্শ অনুযায়ী কমপক্ষে চারবার সেবা নেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষ প্রসব সেবার ব্যবহারও অনেক বেড়েছে। সেবাদানকারীর সহায়তায় প্রসবের হার ১৬ থেকে ৪২ শতাংশ। বর্তমানে প্রতি ১০টি প্রসবের মধ্যে চারটি প্রসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারীর সাহায্যে হচ্ছে। জরিপে দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছরের প্রায় ১৭ হাজার ৯০০ জন বিবাহিত নারীর কাছ থেকে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও, সাকসবজি ও মাছের উৎপাদন আগের তুলনায় বাড়লেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে এখনো অপুষ্টিজনিত খর্বতা ও কৃশতা প্রত্যাশিত মাত্রায় হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি যদিও হচ্ছে, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় মন্থরগতিতে ঘটছে। এ জন্য খাদ্যনিরাপত্তা, নারী-শিশুসহ সব বয়সী মানুষের পুষ্টির ব্যাপারে সরকারকে বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি