বৃহস্পতিবার ১৬ অগাস্ট ২০১৮
  • প্রচ্ছদ » ইন্টারভিউ » আলোকিত সময়কে মার্কেন্টাইল ব্যাংক চেয়ারম্যান
    প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে



আলোকিত সময়কে মার্কেন্টাইল ব্যাংক চেয়ারম্যান
প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে


আলোকিত সময় :
13.09.2017

ইয়াছিন রনি : বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১৯৯৯ সালে কার্যক্রম শুরু করে। তৃতীয় প্রজšে§র এ ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান একেএম সাহিদ রেজা শিমুল । তিনি পোশাক শিল্প ও বস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রেজা গ্র“পের চেয়ারম্যান। এ ছাড়া তিনি বীমা, আর্থিক সেবা, সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ বহুবিধ ব্যবসা ও শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। সাহিদ রেজা ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি, এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচিত পরিচালক এবং সিআইপি। তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের অন্যতম উদ্যোক্তাও। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোকিত সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন।

কার্যক্রম শুরুর দিন থেকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সঙ্গে আছেন, আপনার অভিজ্ঞতা বলুন?

১৯৯৯ সালের ২ জুন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম আবদুল জলিলের নেতৃত্বে তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংকটি উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই ব্যাংকটির সঙ্গে যুক্ত আছি। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে বর্তমানে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছি। অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদ এবং দক্ষ ও প্রতিশ্র“তিশীল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাংকটি সব শ্রেণির গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে সমর্থ্য হয়। দীর্ঘ দেড় যুগের পথ পরিক্রমায় ব্যাংকটির পরিচালকদের সাথে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক অত্যন্ত সুসংহত।

গ্রাহকদের উন্নত সেবা দিতে ব্যাংকের নতুন কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?

মার্কেন্টাইল ব্যাংক সবসময়ই সময়োপযোগী পরিকল্পনার আলোকে গ্রাহকদের উন্নত সেবা দিয়ে আসছে। ব্যাংকটি বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এনআরবি ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, এটিএম সার্ভিস, এসএমএস সার্ভিসসহ সব ধরনের প্রচলিত ও আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা দিয়ে আসছে। এছাড়াও বিশ্বমানের যেকোন ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।

ব্যাংকের ঋণ ও আমানত প্রবৃদ্ধি কেমন? এখন যে পর্যায়ে রয়েছে তাতে পরিচালনা পর্ষদ সন্তুষ্ট কি-না?
ঋণ আমানত অনুপাতও ভালো অবস্থানে রয়েছে। আমরা টেকসই প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বাসী। আমাদের ব্যাংকটি ভালো ব্যবসা করছে। ২০১৬ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ট দেয়া হয়েছে। আগামী বছর আমরা আরও ভালো লভ্যাংশ দেয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপকদের দায়িত্ব আলাদাভাবে বণ্টন করে দিয়েছে। আপনাদের ব্যাংক সে অনুযায়ী পরিচালিত হয় কি?

মার্কেন্টাইল ব্যাংক সবসময়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম ও নির্দেশনা মেনে ব্যাংকিং করে থাকে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্য নিজের কাজের বাইরে গিয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর যেমন হস্তক্ষেপ করে না, আবার প্রয়োজনীয় নজরদারিতে অবহেলাও করে না। এ কারণে পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কখনো সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়নি।

ব্যাংকিং খাতকে আরও লাভজনক এবং ব্যবসাবান্ধব করতে আপনার পরামর্শ কী?

ব্যাংকিং খাতকে আরও বেশি লাভজনক, স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব করতে হলে অভ্যন্তরীণ দক্ষ ও সৎ ব্যবস্থাপনা যেমন দরকার, তেমনি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিও ব্যবসাবান্ধব থাকা দরকার। বিশেষ করে রাজনৈতিক কোনো চাপ যদি ব্যবস্থাপনার ওপর না থাকে তাহলে ব্যাংকিং বিনিয়োগ যথেষ্ট নিরাপদ ও ব্যবসা সফল হয়। কারণ তখন সঠিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়। আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদের হার কমাতে হবে। আমাদের দেশে এই ঋণের সুদের হার এত বেশি যেটা বিশ্বের আর কোনো দেশে নেই। তাই আমি আশা করব, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়টিতে বিশেষ নজর দেবে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা যেন অসুস্থ কিংবা নীতি বিরুদ্ধ না হয়ে পরে সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও সতর্ক নজরদারি প্রয়োজন, তা না হলে ব্যাংকিং ব্যবসায় স্থিতিশীলতা নষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রবল।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক কল্যাণমুখী ব্যাংকিংয়ে বিশ্বাসী। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক, স্থায়ী কিংবা আপদকালীন সব প্রকারেই দরিদ্র সুবিধা বঞ্চিতদের শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত জনপদে ত্রাণ সাহায্য এবং সমাজ গঠন, সমাজ কল্যাণমুখী ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তায় আমাদের অংশগ্রহণ ব্যাংকিং জগতে আলোচিত ও সুপ্রশংসিত।
কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে ব্যয়ের জন্য মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফাউন্ডেশন করা হয়েছে। যেখানে প্রতি বছরের মুনাফার এক শতাংশ অথবা চার মিলিয়ন (যেটা বেশি) আমরা আলাদা করে রাখি। এ বছর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৩ কোটি টাকা প্রদান করেছে। এ ছাড়াও বিভিন্নভাবে ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত আছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের দুই কোটি টাকা দিয়েছে। ‘সিডর’ আক্রান্তদের এক কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহে ক্ষতিগ্রস্ত চারটি পরিবারের ১২ বছরের দায়িত্ব নেয়া হয়েছে। প্রতি বছর শীতের সময় শীতবস্ত্র দেয়া হয়। এছাড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অর্থ সহায়তায় ‘মার্কেন্টাইল ব্যাংক আব্দুল জলিল শিক্ষাবৃত্তি’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর এক কোটি টাকারও বেশি বৃত্তি দিয়ে থাকে। অন্যদিকে অর্থাভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে নেয়া কষ্টসাধ্য এমন অনেকের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় এক লক্ষ টাকার এফডিআর করে দেয়া হয়, যা থেকে প্রাপ্ত মাসিক মূনাফা প্রতি মাসে তার শিক্ষা ব্যয়ে দেয়া হয়। শিক্ষাজীবন শেষে তার সনদপত্র প্রমাণ সাপেক্ষে আবার এই মূল অর্থও তাকে দিয়ে দেয়া হয়। সিএসআরের আওতায় লেবার ফাউন্ডেশনকে ২০ লাখ, কিডনি ফাউন্ডেশনকে ৫০ লাখ, বারডেম হাসপাতালে একটি রুম, পিজি হাসপাতালে একটি গাড়ি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গাড়ি, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী হাসপাতালের জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স, সাহেদা গফুর ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স প্রদান ও ভবন নির্মাণে অর্থ সাহায্য দেয়া হয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতালে ‘আব্দুল জলিল হেমোডায়ালাইসিস সেন্টার’ সম্পুর্ণ মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের অর্থ সহায়তায় বিশ্বমানের পূর্ণাঙ্গ একটি ডায়ালাইসিস সেন্টার যা ওই জেলা ছাড়াও উত্তরবঙ্গের একটি বৃহৎ অংশের অসহায় কিডনী রোগীদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। এছাড়াও আমরা ঢাকার উত্তরায় বিশ্বমানের আধুনিক একটি হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু করেছি।
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বিশেষ কোন অর্জন আছে কী?

অবশ্যই আছে। দেশের বেশকিছু ব্যাংকিং ব্যবসানীতি ও প্রচলনে মার্কেন্টাইল ব্যাংক নিজেকে পথিকৃৎ দাবী করতে পারে। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরুর সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে কোন ঋণ সুবিধা নেবোনা। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক আইন জারী করে, ব্যাংকিং বিনিয়োগ নিরাপদ করতে এটি ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

যাত্রার শুরু থেকেই আমরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জলিল ভাই সবসময় তেলমাথায় তেল না দিয়ে সমাজের অনগ্রসর অংশকে সহযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে একটি প্রকৃত ভারসাম্যমূলক উন্নয়নের কথা বলতেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই ঋণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে গ্রামীণ শাখা সম্প্রসারণে আইন জারী করে।

কৃষকদের ১০ টাকার একাউন্ট খোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের বহু আগেই আমরা প্রান্তিক পথ ব্যবসায়ী ও পান-চা, বাদাম বিক্রেতার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের শুধু সামাজিক গ্যারান্টিতেই ঋণ সুবিধা দিয়েছি।

আগামী ১০ বছর পর মার্কেন্টাইল ব্যাংককে কোন পর্যায়ে দেখতে চান?

আগামী ১০ বছর পর মার্কেন্টাইল ব্যাংককে ব্যাংকিং জগতে বাংলাদেশের শীর্ষ প্রতিনিধিত্বকারী ব্যাংক হিসেবে দেখতে চাই। ব্যবসায়িক পরিধি ও মুনাফা, ব্যাংকিং সেবা, গ্রাহক আস্থায় ব্যাংকটির সুনাম দেশের গন্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর স্বনামধন্য ব্যাংকসমূহের সারিতে পরিগণিত হবে বলে আমি প্রত্যাশা করি।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি