বুধবার ১৭ অক্টোবর ২০১৮



একজন নিভৃতচারী কবি ও চিত্রশিল্পীর আত্নকথা


আলোকিত সময় :
31.08.2017

এস এম সোহেল রানা, শ্রীপুর-গাজীপুর : কথা হল একজন নীরব নিভৃতে আপন মনে কাজ করে যাওয়া একজন কবি ও চিত্রশিল্পীর সাথে।

সময় ফুরিয়ে যায়, জীবনের সব লেনদেন থেমে যায়,শুধু কথা গুলো রয়ে যায়।
স্রোত পাল্টে যায়,ঋতু বদলে যায়,তবু চিহ্ন তার থেকে যায়।
আপন পর হয়ে যায়,কাছের মানুষ দূরে সরে যায়,তবু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।
ভালবাসা হারিয়ে যায়,জীবনের পাতা ছিড়ে যায়,তবু হৃদয় অতীতকেই ফিরে পেতে চায়।

-অসাধারণ ও প্রাঞ্জল এসব শব্দে এভাবেই কবিতা লিখে ও অভিনব সব চিত্র এঁকে মানুষকে সুন্দরের পথে আহবান করেন তিনি।বর্তমান সমাজে মানুষের মাঝে স্বার্থপরতা, হিংস্রতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ যেভাবে প্রকট হয়ে উঠছে তাতে বিচলিত অরণ্যঘেরা গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার এক পল্লীর বাসিন্দা ‘শিল্পীকবি’ শেখ মোঃ কামরুল হাসান শিপন।

একাধারে একজন চিত্রশিল্পী, কবি ও সমাজকর্মী শিপন মনে করেন, সমাজে যদি সুন্দরের চর্চা হয়, মানুষের মাঝে মানবিকবোধ জাগ্রত হয়-তবেই বদলে যাবে সমাজ। সম্প্রতি এই ‘শিল্পীকবি’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এসব ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।

‘সময় ফুরিয়ে যায়, জীবনের সব লেনদেন থেমে যায়,শুধু কথা গুলো রয়ে যায়।স্রোত পাল্টে যায়,ঋতু বদলে যায়,তবু চিহ্ন তার থেকে যায়।আপন পর হয়ে যায়,কাছের মানুষ দূরে সরে যায়,তবু স্মৃতিগুলো রয়ে যায়।ভালবাসা হারিয়ে যায়, জীবনের পাতা ছিড়ে যায়, তবু হৃদয় অতীতকেই ফিরে পেতে চায়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সত্যিকথা বলতে কি সময়ের স্রোত ধারায় বাংলার গ্রামগুলো দিনে দিনে ব্যস্ত শহরে পরিণত হচ্ছে। আর সেই সাথে গ্রামের প্রকৃতি ছায়া ঢাকা আঁকা বাঁকা মেঠো পথ পল্লীর মাঠ প্রান্তর মানুষের সহজ সরল জীবন যাপন সবকিছুই যেন হারিয়ে যাচ্ছে। স্বার্থপরতা, হিংস্রতা, ঘৃণা, বিদ্বেষে মানুষের স্নেহ, মায়া-মমতা, প্রেম-ভালবাসা, পরোপকার, সহমর্মিতা, সহানুভূতি-এসব মানবিক গুণগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর এরই ফলশ্র“তিতে বর্তমানে মানুষের মাঝে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।’

নিভৃতচারী এই শিল্পী মনে করেন, তার এ সুন্দরের আয়োজনগুলো মানুষের মনে কিছুটা হলেও মানবিকতা পরিবর্তন আনতে সহায়ক করবে। সুন্দরের সংস্পর্শে এসে মানুষের মনের অসুন্দর একদিন দূর হবে।

‘শিল্পীকবি’ শেখ মোঃ কামরুল হাসান শিপনের আর্টের স্কুলের নাম তাইব আর্ট, মাওনা চৌরাস্তা হতে ১ কিলোমিটার দক্ষিণে ইয়াসমিন স্পিনিং মিলস লিমিটেডের এর পূর্বে চন্নপাড়া সুন্নাহ মসজিদ মাদ্রাসা মার্কেটে তার কর্মস্থান। তাকে সে মার্কেটে সংলগ্ন কাকলী ফার্ণিচারের “কাসেম ভিলার” দেয়ালে একটি রং তুলি নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়।

কথা বলে জানা গেছে, তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পই নন-বাণী সংগ্রাহকও। ছন্দ, গান, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, নবীনবাণী, কথিকা, কৌতুক, রম্য, রচনা, উপন্যাস, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে যৌক্তিক আলোচনা সহ অভিনয় এবং আকৃতিও করে থাকেন।

ভ্রমণ অভিঙ্গতা লেখা সহ তিনি প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকা ছাড়াও জরি, চমকি, সুই সুতোর দ্বারা গোলাপ, শাপলা, জবা সহ বিভিন্ন ফুলের ওয়ালম্যাট ও আরবী, বাংলা এবং ইংরেজি ক্যালিউগ্রাফি তৈরী বাঁধাই বিক্রি করেন ও অর্ডার নেন। জন্ম তারিখ, বিবাহ তারিখ ও মৃত্যু তারিখ জরি, চমকি দ্বারা লিখে বাঁধাই করেন। আবার সার্ট, গেঞ্জি, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, থ্রি-পিজ, জামা, র্উনা শাড়ী, চাঁদর ইত্যাদিতে এমব্রয়ডারি, ব্লক, বাটিক, টাইডাই করা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন হস্ত শিল্প ও তৈরি করেন। তার হস্তশিল্পের মাঝে নৌকা ও ধানের শীষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দলীয় প্রতীক হিসাবে বিশেষ সমাদরে গৃহীত হয়।

একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে সাইন বোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, ডিজিটাল প্রিন্ট, ওয়াল রাইটিং এর কাজ করেন শিপন। আবার এরই ফাঁকে ফাঁকে অনেক ব্যস্ততার মাঝেও সময় সুযোগ করে আবহমান গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে নিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকেন। আর সে দৃশ্য সাধারণ খেটে খাওয়া অধিকার বঞ্চিত মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্ন, প্রত্যাশা প্রাপ্তির ছবি ফুটে উঠে। কবি নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবানন্দ দাশ সহ আরো অসংখ্য কবির লেখা কবিতা বা গানের অনুসরনে বা পুরনো দিনের জনপ্রিয় বাংলা ছায়া ছবির গান ও ভারতীয় শিল্পীদের আধুনিক বাংলা গানের অনুসরণে তিনি ছবি আঁকেন।

কাজের ধরণ ও মানের পাশাপাশি ক্রেতার সাথে পূর্ব সর্ম্পকের ভিক্তিতে দামের পার্থক্য হয়ে থাকে। যেমন প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো ২০০ টাকা হতে ৫০০০ টাকা, ওয়ালম্যাট ২০০ টাকা হতে ৩০০০ টাকা, ক্যালিউগ্রাফী ৫০০ টাকা হতে ৫০০০ টাকা, হস্তশিল্প ১০ টাকা হতে ২০০০ টাকা, কাপড়ে কাজ করা ১০ টাকা হতে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সর্ম্পকে তিনি জানান, এ তাইব আর্টেয় ৭ টি শাখা রয়েছে। যা-১. প্রচার শাখা, ২.হস্তশিল্প শাখা, ৩.আল্পনা শাখা, ৪.শিক্ষা সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ক্রিড়া শাখা, ৫.গার্ডেনিং প্ল্যান শাখা, ৭.ভ্রমন শাখা, ৮.জনসেবা শাখা। ভবিষ্যতে আগামী প্রজন্মও শিশু কিশোরদের উন্নত চিন্তা চেতনা মন মানষিকতা ও দেশ প্রেম এবং মানবতাবোধে জাগ্রত করার মহত লক্ষ্যে এ ৭টি শাখাই চালু করবেন বলে তিনি আশাবাদী।

ধর্মবোধ এবং সৌন্দর্য প্রিয়তা সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ধর্ম এবং সৌন্দর্য বোধ একে অন্যের পরিপূরক। মহান সৃষ্টিকর্তা সকল সুন্দরের আধার সে সুন্দরতা সকল সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার উর্ধ্বে অবস্থান করে। সকল ধর্মের মানুষকে লালন পালন করছেন। কিন্তু মানুষের ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ঞ্জানের অভাব জন্ম দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক হানাহানি, বিদ্বেষ ও জঙ্গিবাদ।

জীবনে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি কতটুকু-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একজন মা কোন বিনিময়ের আশা না রেখে যেমন করে শুধু তার মাতৃত্বের স্বাভাবিক প্রবণতাতেই সমাজ সংসারের হাজারো মানুষের বাঁকা দৃষ্টি আর তীর্যক মন্তব্য ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্যতা সয়েও তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে লালন পালন করেন। আমিও তেমনি কোন নাম যশ-খ্যাতির আশা না করে এ সমাজ সংসারের হাজারো তিক্ত বিরোধিতা ও তাচ্ছিল্য সহ্যকরে থাকি।’

‘এ লেখাগুলো কোন ছন্দের খাতিরে ছন্দ লেখা বা সস্তা জীবন বোধের বস্তপঁচা কথোপকথন ছিলনা। সেখানে ছিল মানবতার কথা, নারীর অধিকারের কথা, দেশাত্ববোধের কথা, ঘন কালো রাত্রির অন্ধকার শেষে ভোরের আলো ফোটার কথা কিন্তু সে আলো ফোটাতে গিয়ে আমি নিজেই আমার জীবনের আলো হারিয়ে ফেলেছি। তবু একদিন তমসাবৃত্ত রাত্রির অবসান হবে কোন এক আলোর মশালবাহী এসে একদিন আমাকে প্রত্যাশিত প্রান্তরে নিয়ে যাবে। এ আশায় আজো হাল ধরে আছি’-যোগ করেন এই ‘শিল্পীকবি।’

কামরুল হাসান গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসবার তাবলীগ জামাত আমীর মরহুম জুবেদ আলী মুন্সীর ৫ ছেলে ও ৩ কন্যার মধ্যে কনিষ্ঠ সন্তান। তিনি ১৯৮০ সনের ৩০ নভেম্বর চন্নাপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৫ সনে মাওনা হাই স্কুল হতে এস. এস. সি, ১৯৯৭ ইং সনে পিয়ার আলী ডিগ্রি কলেজ হতে এইচ. এস. সি পাশ করেন এবং ১৯৯৯ ইং সলে উক্ত কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি