বুধবার ১৭ অক্টোবর ২০১৮



প্রসঙ্গ: চিকুনগুনিয়া


আলোকিত সময় :
14.06.2017

কে এন এন লিংকু: আমার বন্ধু এবং সহকর্মী জালাল। কর্মঠ এবং মোটামুটি সর্বকাজে পারদর্শী। একটিভ। সকাল থেকে মোবাইলে একের পর এক ফোন করছি, রিং বাজছে কিন্তু কোন উত্তর নাই। আমার রাগ এবং বিরক্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। দু’তিন দিন বাদে রমজান শুরু হচ্ছে, এবার প্রচণ্ড গরম পড়ছে, দিনও বড়। রমজান মাসের প্রথম সপ্তাহে মানুষজন দুর্বল হয়ে পড়ে, স্বাভাবিক অফিস ওয়ার্ক ঠিক মতো হবে না, তাছাড়া অফিস সময়ও আধাবেলা। হাতে দু-একটা দিন আছে দ্রুত গুছিয়ে নিতে হবে। অনেক কাজ পড়ে আছে। সারাদিন জালাল নামক ব্যক্তিকে ফোনে পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে ভাবলাম, লোকটার হলোটা কি? মোবাইল ফোনকে রীতিমতো টিএন্ডটি ফোন বানিয়ে ফেলেছে। টিএন্ডটি ফোন যেমন রিং হয় সারাদিন, পরে দেখা গেল যাকে ফোন করেছি সে বাড়িতেই নেই। বাড়ি ছিল তালাবদ্ধ। কিন্তু এটাতো আর টিএন্ডটি ফোন বা ল্যান্ড ফোন না, মোবাইল ফোন মুভমেন্টেই থাকে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন নষ্ট হয়ে গেল। পরের দিন দুপুরের দিকে আমি হঠাত্ আমার কাঙ্ক্ষিত ফোন পেয়ে গেলাম। আমি বিরক্তি নিয়ে এক গাদা কথা বলার পর একটু থামলাম। ওপাশ বেশ চুপচাপ। একটু পর খুবই দুর্বল আর চিকন সুরে বলতে শুনলাম, ভাই আমার চিকনগুনিয়া হয়েছে, আমি সরি, আমার ফোন সাইলেন্ট করা ছিল আমি পরে … মোবাইল বন্ধ হয়ে গেল।

কথা শেষ হলো না, আমি হতভম্বের মতো বসে রইলাম। চিকনগুনিয়া আবার কি বিষয়? তবে সে যে খুবই শক্তিশালী আমি অনুমান করে নিলাম, একদিনেই হাতির মতো জালালকে ফেলে দিয়েছে। আমি হতাশ হয়ে খুঁজতে লাগলাম সমস্যাটা কি? ক’দিন পর এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম, এটা ডেঙ্গুর মতো এক ধরনের জ্বর যার নাম চিকুনগুনিয়া। কথ্য ভাষায় এর মধ্যে প্রচলিত হয়ে গেছে চিকন জ্বর নামে। মূলত এ্যাডিস মশার কামড় থেকেই এই রোগের বিস্তার।

চিকনগুনিয়া (Chikungunya-CHIKV) ভাইরাসই হচ্ছে এই জ্বরের মূল হোতা। সাধারণভাবে বললে এটা একটা ভাইরাল জ্বর বা ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত জ্বর। প্রধান লক্ষণ অতিমাত্রায় জ্বর এবং শরীরের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা। অন্যান্য উপসর্গগুলির মধ্যে মাথাব্যথা, দুর্বলতা, পেশীব্যথা, কারো কারো ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব এবং শরীরে র্যাশ। এই জ্বরে চোখ জ্বালাপোড়া করলেও অন্যান্য জ্বরের মতো কাঁপুনি বা মাঝে মাঝে ঘামের মতো হয় না। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তিরা সর্বনম্নি দুই থেকে সর্বোচ্চ বার বা পনের দিন পর্যন্ত ভুগতে পারেন। তবে শরীরের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা এবং দুর্বলতা থেকে যাওয়ার ভাব দেখা গেছে। মানুষ সুস্থ হওয়ার পরও স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরে আসতে বেশ কিছুদিন লেগে যায়। চিকিত্সা হিসাবে পূর্ণ বিশ্রামকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং তরল খাবার খেতে হবে। শরীর শীতল রাখার ব্যবস্থা, পানি বা ভেজা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে শরীর মুছতে হবে। স্বাভাবিক প্যারাসিটামল, এর বেশি না খেলেই ভালো। যেহেতু মশার মাধ্যামে এই রোগটা ছড়ায় তাই আক্রান্ত বা অসুস্থ রোগীকে মশারির ভেতরে রাখাই উত্তম। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারে একজন আক্রান্ত হওয়ার পর অন্যদের মধ্যেই দ্রুত এই রোগ ছড়িয়ে পরে। এই জন্যই এই সাবধানতা প্রয়োজন।
আর একটু বিস্তারিত খোঁজ নেয়া যাক :
বৈজ্ঞানিক নাম : চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (Chikungunya- CHIKV)
র্যাঙ্ক (Rank) : স্পিসি&স বা প্রজাতি
উচ্চ শ্রেণিবিন্যাস : আলফাভারিস
লক্ষণ : জ্বর, জয়েন্টে ব্যথা, দুর্বলতা, র্যাশ বা ফুসকরি।
কারণ : মশার দ্বারা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া।
স্থিতিকাল : ২ থেকে ১০/১২ দিন।
চিকিত্সা : রোগীর স্বাভাবিক যত্ন এবং প্যারাসিটামলই মূল চিকিত্সা। প্রচুর বিশ্রাম। তবে ব্লাড টেস্টের (RNA) মাধ্যামে আগে কনর্ফাম হতে হবে।
চিকুনগুনিয়াকে ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন (WHO) ডেঙ্গু বা জিকা ভাইরাস-এর সঙ্গে একই কাতারে ফেললেও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসটি তুলনামূলক দুর্বল । মানুষকে ভোগানি্ত ছাড়া তেমন বড় কোন অর্গানের ক্ষতি করতে পারে না।
এক হাজার আক্রানে্তর মধ্যে মৃতু্যর হার একজন বার তার চেয়েও কম। তবে খুবই অল্প বয়স, পুরাতন বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা যাদের রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে চিন্তা করতে হবে। এই ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দুই ধরনের মশাই দায়ী – Aedes Albopictus এবং Aedes Aegypti । সাধারণত দিনের সময়ই এই ভাইরাস বহনকারী মশা কামড়ায়। এই মশা শুধুু মানুষ নয়, পাখি এবং চিংড়ি জাতীয় মাছের মধ্যেও এই ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।
যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো টিকা অথবা আগাম প্রতিশেধক নেই, তাই মহামারি থেকে বাঁচার উপায় আপাতত সামাজিক সচেতনতা, মশার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ। মশার বংশ বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আক্রান্ত রোগী হতে রোগ না ছড়ানোর জন্য মশারি বা অনুরূপ ব্যবস্থায় রুগিকে রাখতে হবে।
এই রোগের প্রাদুর্ভাব ২০০০ সন থেকে আফ্রিকা এবং এশিয়াতে প্রথম লক্ষ্য করা যায়। ২০১৪ এর মধ্যে প্রায় ১ মিলিয়ন বা দশ লাখ লোককে CHIKV ভাইরাসে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। একই সময় অর্থাত্ ২০১৪ সালের দিকে আমেরিকার ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যেও এর প্রকোপ ধরা পড়ে। এই রোগটা প্রথম ১৯৫২ সালে তানজানিয়ায় নায়লা জেলার সোয়াহিলি গ্রামে শনাক্ত হয়। ‘Klmakande’ ভাষা থেকে এর নামকরণ করা হয়, যার অর্থ ‘Stooped Walk’ বা হাটা বন্ধ’। সম্ভবত আক্রান্ত মানুষজনেরা বিভিন্ন জয়েন্টের ব্যথার কারণে আফ্রিকার শক্ত রাস্তা-ঘাটে দীর্ঘদিন হাটাচলা করতে পারতো না বলেই এই নামকরণ অনুমান করা হয়।
ভেৌগোলিক অবস্থান এবং প্রায় একই রকম আবহাওয়ার কারণে দুর্ভাগ্যবশত আফ্রিকার দরিদ্রদেশের দুর্গম এলাকার বিভিন্ন মশা, পোকামাকড় বা পানিবাহিত রোগগুলো দ্রুত এশিয়ার দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপ, আমেরিকা বা শীত প্রধান দেশগুলোতে অতিরিক্ত সময় বরফ আচ্ছন্ন এবং উন্নত অবকাঠামো এবং আগাম সচেতনতার কারণে সাধারণত তারা আক্রান্ত হয় না।

লেখক: কলামিষ্ট



এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি